বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে এক অপরাজেয় শক্তির নাম হলো ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল। ক্রিকেটের প্রতি এদেশের মানুষের আবেগ এবং উন্মাদনা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। ১৯৩২ সালে লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা এই দলটি আজ বিশ্বের প্রতিটি ফরম্যাটে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। ভারতের ক্রিকেটীয় যাত্রা কেবল মাঠের লড়াই নয়, বরং এটি কোটি কোটি ভক্তের স্বপ্ন ও আবেগের প্রতিফলন। আজকের এই বিস্তারিত আর্টিকেলে আমরা ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল এর অতীত, বর্তমান এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল এর শুরুর ইতিহাস
ভারতের ক্রিকেটের ইতিহাস বেশ পুরনো। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকার সময় থেকেই এখানে ক্রিকেটের প্রচলন শুরু হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৩২ সালের ২৫ জুন। সি.কে. নাইডুর নেতৃত্বে ইংল্যান্ডের লর্ডসে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলে ভারত। যদিও শুরুর দিকে দলটিকে জয়ের জন্য বেশ লড়াই করতে হয়েছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ভারত নিজেদের বিশ্বমানের দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় আসে ১৯৫২ সালে মাদ্রাজ টেস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। এরপর থেকে ভারতের ক্রিকেট এগিয়ে যেতে থাকে এক নতুন উচ্চতায়। বিশেষ করে সত্তরের দশকে সুনীল গাভাস্কার এবং গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের মতো ব্যাটারদের উত্থান ভারতকে শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপের তকমা এনে দেয়।
আরও জেনে রাখুনঃ পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দল
বিশ্ব ক্রিকেটে বিপ্লব: ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ জয়
ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল এর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল ১৯৮৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়। তখনকার অজেয় দল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে কপিল দেবের নেতৃত্বে লর্ডসের বারান্দায় যখন ট্রফি উঁচিয়ে ধরে ভারত, তখন থেকেই এদেশের ক্রিকেটের মোড় ঘুরে যায়। এই জয় কেবল একটি ট্রফি ছিল না, বরং এটি ভারতীয় তরুণ প্রজন্মের মনে ক্রিকেটের প্রতি এক গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি করে। শচীন টেন্ডুলকার থেকে শুরু করে সৌরভ গাঙ্গুলি—সবাই এই ১৯৮৩ সালের জয় থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।
ডমিন্যান্স এবং ধোনি যুগ (২০০৭-২০১৩)
ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল এর সোনালী সময়ের কথা বললে মহেন্দ্র সিং ধোনির নাম সবার আগে আসবে। তার নেতৃত্বে ভারত আইসিসি’র প্রধান তিনটি ট্রফিই জয় করতে সক্ষম হয়।
১. ২০০৭ টি২০ বিশ্বকাপ: দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত প্রথম টি২০ বিশ্বকাপে তরুণ এক দলকে নিয়ে শিরোপা জয় করে ক্রিকেট বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন ধোনি।
২. ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ: ২৮ বছর পর ঘরের মাটিতে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ভারত। ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ধোনির সেই শেষ ছক্কাটি আজও প্রতিটি ভারতীয়র হৃদয়ে গেঁথে আছে।
৩. ২০১৩ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি: ইংল্যান্ডের মাটিতে স্বাগতিকদের হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয় করে ভারত আইসিসি’র সব ফরম্যাটে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করে।
আরও জেনে রাখুনঃ বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল
পরিসংখ্যান ও অর্জন: ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল
নিচে ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল এর প্রধান কিছু আইসিসি অর্জনের তালিকা দেওয়া হলো:
| টুর্নামেন্ট | অর্জনের বছর | অধিনায়ক |
| ওয়ানডে বিশ্বকাপ | ১৯৮৩, ২০১১ | কপিল দেব, এম এস ধোনি |
| টি২০ বিশ্বকাপ | ২০০৭, ২০২৪ | এম এস ধোনি, রোহিত শর্মা |
| চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি | ২০০২ (যুগ্ম), ২০১৩ | সৌরভ গাঙ্গুলি, এম এস ধোনি |
| এশিয়া কাপ | একাধিকবার | বিভিন্ন সময় |
আধুনিক ক্রিকেটে ভারতের শক্তি: কোহলি ও রোহিত যুগ
বর্তমানে ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত। বিরাট কোহলি যখন দলের দায়িত্ব নেন, তখন তিনি ভারতীয় দলের মধ্যে এক আগ্রাসী মানসিকতা এবং ফিটনেস কালচার নিয়ে আসেন। তার নেতৃত্বে ভারত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার টেস্ট সিরিজ জয়ের গৌরব অর্জন করে।
পরবর্তীতে রোহিত শর্মা দলের হাল ধরেন এবং ২০২৪ সালে বার্বাডোসে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে ভারতকে দ্বিতীয়বারের মতো টি২০ বিশ্বকাপ ট্রফি উপহার দেন। রোহিত শর্মা এবং বিরাট কোহলির মতো কিংবদন্তিদের উপস্থিতি ভারতকে যেকোনো কন্ডিশনে ফেভারিট হিসেবে গণ্য করতে সাহায্য করে। জাসপ্রিত বুমরাহ, ঋষভ পান্ত এবং হার্দিক পান্ডিয়ার মতো খেলোয়াড়রা বর্তমান দলের মূল স্তম্ভ।
আরও জেনে রাখুনঃ ওমান জাতীয় ক্রিকেট দল
ভারতীয় ঘরোয়া ক্রিকেট ও আইপিএল (IPL)
ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল এর এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করে তাদের ঘরোয়া কাঠামো। রঞ্জি ট্রফি, দলীপ ট্রফি এবং বিজয় হাজারে ট্রফি থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক স্তরে খেলার জন্য প্রস্তুত থাকে। তবে ২০০৮ সালে আইপিএল চালু হওয়ার পর ভারতের ক্রিকেট অন্য মাত্রা পায়। আইপিএল কেবল অর্থ নয়, বরং বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের সাথে ড্রেসিংরুম শেয়ার করার মাধ্যমে তরুণ খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে।
কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের তালিকা
ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল অনেক কিংবদন্তি জন্ম দিয়েছে যারা ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবেন।
-
সুনীল গাভাস্কার: প্রথম ব্যাটার হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে ১০,০০০ রান পূর্ণ করেন।
-
কপিল দেব: ভারতের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার।
-
শচীন টেন্ডুলকার: যাকে ‘ক্রিকেটের ঈশ্বর’ বলা হয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০০টি সেঞ্চুরির মালিক।
-
সৌরভ গাঙ্গুলি: ভারতীয় দলে লড়াকু মানসিকতা এবং বিদেশের মাটিতে জয়ের সাহস তৈরি করেছিলেন।
-
রাহুল দ্রাবিড়: ‘দ্য ওয়াল’ খ্যাত এই ব্যাটার ছিলেন টেস্ট ক্রিকেটের আদর্শ।
-
অনিল কুম্বলে: টেস্টে এক ইনিংসে ১০ উইকেট নেওয়ার বিরল কীর্তি যার দখলে।
বিদেশের মাটিতে সাফল্য
আগে বলা হতো ভারত কেবল নিজেদের মাটিতেই শক্তিশালী। কিন্তু বর্তমান ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ভারতের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স চোখ ধাঁধানো। পেস বোলারদের আধিক্য ভারতকে এখন বিদেশের মাটিতেও দাপট দেখাতে সাহায্য করছে। মহম্মদ সামি, মোহাম্মদ সিরাজ এবং বুমরাহ বর্তমানে বিশ্বের যেকোনো ব্যাটিং লাইনআপকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
প্রশ্ন-উত্তর সেকশন (FAQs)
১. ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল কতবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছে?
উত্তর: ভারত এখন পর্যন্ত দুইবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছে। প্রথমবার ১৯৮৩ সালে এবং দ্বিতীয়বার ২০১১ সালে।
২. ভারতের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক কে ছিলেন?
উত্তর: ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল এর প্রথম টেস্ট অধিনায়ক ছিলেন সি.কে. নাইডু (C.K. Nayudu)।
৩. ২০২৪ সালের টি২০ বিশ্বকাপে ভারতের অধিনায়ক কে ছিলেন?
উত্তর: ২০২৪ টি২০ বিশ্বকাপে ভারতের অধিনায়ক ছিলেন রোহিত শর্মা। তার নেতৃত্বেই ভারত অপরাজিত থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়।
৪. ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ক্রিকেট ম্যাচকে হাই-ভোল্টেজ বলা হয় কেন?
উত্তর: দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং ক্রিকেটীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এই ম্যাচ নিয়ে ভক্তদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করে, যা বিশ্বজুড়ে কয়েকশ কোটি মানুষ উপভোগ করেন।
শেষ কথা
ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল আজ কেবল একটি দল নয়, এটি একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড। আর্থিক সচ্ছলতা, প্রতিভাবান খেলোয়াড় এবং বিপুল সংখ্যক ভক্তের সমর্থন ভারতকে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় (ICC) প্রভাবশালী করে তুলেছে। তরুণ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের যে আত্মবিশ্বাস এবং জয়ের ক্ষুধা বর্তমানে লক্ষ্য করা যায়, তাতে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে আগামী দিনগুলোতেও ভারত বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখবে। সাদা বল হোক কিংবা লাল বল—ভারত আজ সবখানেই চ্যাম্পিয়ন।
