অ্যানফিল্ডের গ্যালারিতে কি আগামী মৌসুমে আর শোনা যাবে না ‘মো সালাহ’ বলে সেই চেনা গর্জন? লিভারপুলের রক্ষণভাগের দেয়াল হয়ে কি আর দাঁড়িয়ে থাকবেন না ভার্জিল ফন ডাইক? ফুটবল বিশ্বে এখন এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। লিভারপুল ফুটবল ক্লাব বা ‘অল রেড’দের গত কয়েক বছরের চেনা ছবিটি সম্ভবত খুব দ্রুতই বদলে যেতে চলেছে। ক্লাবটির সাবেক স্ট্রাইকার স্ট্যান কলিমোর এক চাঞ্চল্যকর ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যা লিভারপুল সমর্থকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তার মতে, আগামী গ্রীষ্মকালীন ট্রান্সফার উইন্ডোতেই লিভারপুল ছাড়তে পারেন দলের দুই প্রধান স্তম্ভ মোহাম্মদ সালাহ এবং ভার্জিল ফন ডাইক। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে লিভারপুলের একটি সোনালি যুগের সমাপ্তি ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আর্নে স্লটের ‘লিভারপুল ২.০’ এবং সালাহ-ফন ডাইক বিতর্ক
লিভারপুলের ডাগআউটে এখন নতুন যুগ। ক্লপের বিদায়ের পর আর্নে স্লট দলের দায়িত্ব নিয়েছেন। স্লট তার নিজস্ব ফুটবল দর্শন এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু এই পরিকল্পনায় মোহাম্মদ সালাহ ও ভার্জিল ফন ডাইক ঠিক কতটা মানানসই, তা নিয়ে ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা মতভেদ রয়েছে। যদিও গত মৌসুমে এই দুই তারকা ২০২৭ সাল পর্যন্ত নতুন চুক্তিতে সই করেছেন, তবুও তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। রেকর্ড গড়ে দলে আনা তরুণদের সুযোগ করে দিতেই হয়তো এই অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের বিদায় দেওয়ার পথে হাঁটছে লিভারপুল কর্তৃপক্ষ।
কেন বিদায় ঘণ্টা বাজছে এই দুই অভিজ্ঞ তারকার?
ফুটবল একটি গতিশীল খেলা যেখানে সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন অনিবার্য। লিভারপুলের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। স্ট্যান কলিমোর মনে করেন, স্লট যদি তার ‘লিভারপুল ২.০’ প্রজেক্ট সফল করতে চান, তবে তাকে কঠোর কিছু সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। নতুন এবং তরুণ প্রতিভাদের জন্য দলে জায়গা তৈরি করতে হলে পুরনো এবং অভিজ্ঞদের বিদায় দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বিশেষ করে সালাহ এবং ফন ডাইকের মতো হাই-প্রোফাইল খেলোয়াড়দের সরিয়ে দিলে দলের কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনা সহজ হয়।
| খেলোয়াড়ের নাম | বর্তমান বয়স | চুক্তির মেয়াদ | পজিশন |
| মোহাম্মদ সালাহ | ৩৩ বছর | ২০২৭ | ফরোয়ার্ড |
| ভার্জিল ফন ডাইক | ৩৪ বছর | ২০২৭ | ডিফেন্ডার |
| আলেক্সান্ডার ইসাক | ২৫ বছর | দীর্ঘমেয়াদী | স্ট্রাইকার |
| ফ্লোরিয়ান ভির্টৎস | ২২ বছর | দীর্ঘমেয়াদী | মিডফিল্ডার |
রেকর্ড সাইনিং ও তরুণদের উত্থান
গত মৌসুমে লিভারপুল ট্রান্সফার মার্কেটে বড় ধামাকা দিয়েছিল। প্রায় ২৬ কোটি ইউরো খরচ করে তারা দলে ভিড়িয়েছে সুইডিশ স্ট্রাইকার আলেক্সান্ডার ইসাক এবং জার্মান মিডফিল্ডার ফ্লোরিয়ান ভির্টৎসকে। ইসাকের জন্য ক্লাব খরচ করেছে ১৪ কোটি ৪০ লাখ ইউরো এবং ভির্টৎসের জন্য ১২ কোটি ৫ লাখ ইউরো। যদিও মাঠের পারফরম্যান্স এবং চোটের কারণে তারা এখনো প্রত্যাশা অনুযায়ী জ্বলে উঠতে পারেননি, তবুও ক্লাব ম্যানেজমেন্ট তাদের ওপরই ভরসা রাখছে।
আলেক্সান্ডার ইসাক ও ফ্লোরিয়ান ভির্টৎসের ভূমিকা
লিভারপুলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে মূলত এই দুই তরুণকে কেন্দ্র করেই। ইসাকের গতি এবং গোল করার ক্ষমতা তাকে লিভারপুলের আক্রমণের মূল অস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। অন্যদিকে, ভির্টৎসের সৃজনশীল মিডফিল্ড খেলা দলের মাঝমাঠকে নতুন প্রাণ দিতে সক্ষম। কলিমোরের মতে, যখন হাজার হাজার সমর্থক এই নতুন তারকাদের স্বাগত জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় মাতোয়ারা হয়, তখন সালাহর মতো মহাতারকারা কিছুটা মানসিক চাপে পড়তে পারেন। তারা মনে করতে পারেন যে ক্লাবে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য হয়তো ধীরে ধীরে কমে আসছে।
মোহাম্মদ সালাহ কি অসম্মানিত বোধ করছেন?
লিভারপুলের ইতিহাসে মোহাম্মদ সালাহ একজন কিংবদন্তি। কেনি ডালগ্লিশ, ইয়ান রাশ কিংবা স্টিভেন জেরার্ডদের পাশে তার নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সালাহর কিছু আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যখন নতুনদের নিয়ে মাতামাতি হয়, তখন সালাহর মতো গ্লোবাল আইকনরা মনে করতে পারেন যে তাদের অবদান হয়তো খাটো করে দেখা হচ্ছে। সালাহ কেবল একজন খেলোয়াড় নন, তিনি লিভারপুলের একটি বিশাল ফ্যানবেসের প্রতিনিধি। অনেক সমর্থক কেবল সালাহর জন্যই লিভারপুলকে সমর্থন করেন। কিন্তু পেশাদার ফুটবলে আবেগের চেয়ে ক্লাবের প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই সবসময় বেশি গুরুত্ব পায়।
ভার্জিল ফন ডাইক এবং রক্ষণের ভবিষ্যৎ
ভার্জিল ফন ডাইকের বয়স আগামী জুলাইয়ে ৩৫ বছর পূর্ণ হবে। একজন সেন্টার ব্যাকের জন্য এই বয়সটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ফন ডাইক এখনো বিশ্বমানের ডিফেন্ডিং প্রদর্শন করছেন, তবে দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করলে লিভারপুলকে তার বিকল্প ভাবতেই হবে। হয়তো ক্লাব তাকে আরও এক মৌসুমের জন্য রেখে দিতে পারে অভিজ্ঞতার খাতিরে, কিন্তু সালাহর ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। সালাহর উচ্চমূল্য এবং বর্তমান চাহিদা বিবেচনায় তাকে আগামী গ্রীষ্মেই বিক্রি করে দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এতে করে ক্লাব যেমন বিশাল অঙ্কের অর্থ পাবে, তেমনি বেতন কাঠামোর ওপর থেকেও চাপ কমবে।
স্ট্যান কলিমোরের কড়া বার্তা
গোল ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্ট্যান কলিমোর সরাসরি বলেছেন, “আর্নে স্লট যদি সত্যিকারের পরিবর্তন চান, তবে সালাহ বা ফন ডাইকের মধ্যে অন্তত একজনকে আগামী গ্রীষ্মে ক্লাব ছাড়তে হবে।” তিনি মনে করেন, সালাহর বিদায়টা নিশ্চিতভাবেই ঘটতে যাচ্ছে। লিভারপুল এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে তাদের পুরনো গৌরব ধরে রাখতে হলে নতুন রক্ত সঞ্চালন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
লিভারপুল সমর্থকদের জন্য এটি কতটা বেদনাদায়ক?
যেকোনো ক্লাবের সমর্থকদের জন্য তাদের প্রিয় তারকাদের বিদায় দেখা অত্যন্ত কষ্টের। সালাহ এবং ফন ডাইক লিভারপুলকে প্রিমিয়ার লিগ এবং চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতাতে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাদের বিদায়ে লিভারপুলের এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান ঘটবে ঠিকই, কিন্তু ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসে এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বড় বড় ক্লাবগুলো এভাবেই নিজেদের পুনর্গঠন করে।
লিভারপুলের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?
লিভারপুল ম্যানেজমেন্টকে এখন খুব সতর্কতার সাথে পা বাড়াতে হবে। একদিকে যেমন অভিজ্ঞতার প্রয়োজন আছে, অন্যদিকে তারুণ্যের জোয়ারকেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
-
নতুন প্রতিভা অন্বেষণ: সালাহ চলে গেলে রাইট উইংয়ে কাকে খেলানো হবে, তা নিয়ে এখনই কাজ শুরু করা উচিত।
-
নেতৃত্বের পরিবর্তন: ফন ডাইক ক্লাব ছাড়লে অধিনায়ক হিসেবে কাকে দেখা যাবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।
-
আর্নে স্লটের কৌশল: স্লটকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি সালাহ-ফন ডাইক ছাড়াই একটি শিরোপাজয়ী দল গড়তে সক্ষম।
উপসংহার
লিভারপুল ফুটবল ক্লাব এখন পরিবর্তনের এক নতুন স্রোতে ভাসছে। মোহাম্মদ সালাহ এবং ভার্জিল ফন ডাইকের মতো খেলোয়াড়রা ক্লাবের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবেন। তবে সময়ের প্রয়োজনে এবং আর্নে স্লটের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাদের বিদায় হয়তো অনিবার্য হয়ে পড়েছে। ইসাক এবং ভির্টৎসের মতো তরুণরা যদি দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারেন, তবে লিভারপুল হয়তো খুব শীঘ্রই নতুন এক সোনালি যুগের সূচনা করবে। অ্যানফিল্ডে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, এখন দেখার বিষয় এই পরিবর্তনের শেষ পরিণতি কী হয়।
