ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা—এই প্রবাদটি আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে সম্প্রতি যা ঘটল, তা কেবল অনিশ্চয়তা নয়, বরং এক অবিশ্বাস্য অলৌকিক ঘটনা। লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠ থেকে করাচির জাতীয় স্টেডিয়াম, সময়ের হিসেবে ব্যবধান দীর্ঘ ২৩২ বছর। ১৭৯৪ সালে গড়া ক্রিকেটের এক প্রাচীন বিশ্ব রেকর্ড ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে নতুন ইতিহাস লিখল পাকিস্তান টিভি (PTV) ক্রিকেট দল। পাকিস্তানের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট President’s Trophy Grade-1-এ এই অভাবনীয় কাণ্ডটি ঘটেছে। মাত্র ৪০ রানের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েও ম্যাচ জিতে নিয়েছে তারা, যা First-class cricket বা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক।
পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে ওলট-পালট বিশ্ব রেকর্ডের খাতা
পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটের চার দিনের সংস্করণের এই টুর্নামেন্টে মুখোমুখি হয়েছিল সুই নর্দান গ্যাস পাইপলাইনস (SNGPL) এবং পাকিস্তান টিভি (PTV)। করাচির ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে পিটিভি এমন এক জয় ছিনিয়ে নিয়েছে, যা ক্রিকেট বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ম্যাচের তৃতীয় দিনে এসএনজিপিএল-এর সামনে জয়ের লক্ষ্য ছিল মাত্র ৪০ রান। টেস্ট ক্রিকেটের মেজাজে এই রান তোলা কোনো ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু পিটিভির বোলারদের তাণ্ডবে মাত্র ৩৭ রানেই অলআউট হয়ে যায় এসএনজিপিএল। মাত্র ২ রানের এই নাটকীয় জয় পিটিভিকে বিশ্ব রেকর্ডের শীর্ষে বসিয়ে দিয়েছে।
আরও জেনে নিনঃ লিভারপুলের সোনালি অধ্যায় কি শেষের পথে? সালাহ ও ফন ডাইকের বিদায় নিয়ে তোলপাড়
২৩২ বছর আগের সেই লর্ডসের স্মৃতি
এর আগে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সবচেয়ে কম রানের লক্ষ্য দিয়ে জয়ী হওয়ার রেকর্ডটি ছিল ১৭৯৪ সালের। সেই ম্যাচে লর্ডসের পুরোনো মাঠে ওল্ডফিল্ড বনাম মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের (MCC) লড়াই হয়েছিল। এমসিসিকে ৪১ রানের লক্ষ্য দিয়ে ৬ রানে জিতেছিল ওল্ডফিল্ড। ২৩২ বছর ধরে অক্ষুণ্ণ থাকা সেই রেকর্ডটি আজ পাকিস্তানের করাচি স্টেডিয়ামে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এটি এখন বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত Cricket World Record।
ম্যাচের বিস্তারিত চিত্র: যেভাবে এলো এই মহাকাব্যিক জয়
এই অবিশ্বাস্য ম্যাচের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের দুই ইনিংসের দিকে তাকাতে হবে।
-
প্রথম ইনিংস: পিটিভি তাদের প্রথম ইনিংসে সংগ্রহ করেছিল ১৬৬ রান। জবাবে এসএনজিপিএল তাদের প্রথম ইনিংসে তোলে ২৩৮ রান। ফলে প্রথম ইনিংস শেষে এসএনজিপিএল ৭২ রানের বড় লিড পায়।
-
দ্বিতীয় ইনিংস: পিটিভি তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করতে নেমে চরম বিপর্যয়ে পড়ে। দ্বিতীয় দিন শেষে তাদের স্কোর ছিল ৫ উইকেটে ৯৯ রান। মাত্র ২৭ রানের লিড নিয়ে তারা তৃতীয় দিন শুরু করে।
-
বিপর্যয়: তৃতীয় দিনে মাত্র ১২ রান যোগ করতেই বাকি ৫ উইকেট হারিয়ে ১১১ রানে গুটিয়ে যায় পিটিভি। দলের শেষ ৫টি উইকেট পড়ে মাত্র ৫ রানের ব্যবধানে এবং মাত্র ৮ বলের মধ্যে।
এসএনজিপিএল-এর সামনে মাত্র ৪০ রানের লক্ষ্য
পিটিভির দ্বিতীয় ইনিংস ১১১ রানে শেষ হওয়ায় এসএনজিপিএল-এর সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৪০ রান। আধুনিক ক্রিকেটে যেখানে টি-টুয়েন্টি ম্যাচে ১০-১২ বলে এই রান উঠে যায়, সেখানে চার দিনের ম্যাচে এই লক্ষ্য ছিল একেবারেই নগণ্য। কিন্তু এখানেই লুকিয়ে ছিল নাটকের শেষ অংক।
দুই বোলারের জাদুকরী পারফরম্যান্স: এমাদ বাট ও আলী উসমান
পিটিভির অধিনায়ক জানতেন যে, এই ম্যাচ জিততে হলে অলৌকিক কিছু করতে হবে। আর সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন দলের দুই প্রধান অস্ত্র—পেসার এমাদ বাট এবং বাঁহাতি স্পিনার আলী উসমান। পুরো ১৯.৪ ওভারের স্পেলে পিটিভির এই দুজন ছাড়া আর কেউ বোলিং করার সুযোগ পাননি।
| বোলারের নাম | ওভার | রান | উইকেট | ভূমিকা |
| এমাদ বাট | ১০ | ২৮ | ৪ | পেসার |
| আলী উসমান | ৯.৪ | ৯ | ৬ | স্পিনার |
আলী উসমানের জাদুকরী স্পিন আর এমাদ বাটের নিয়ন্ত্রিত পেসের সামনে এসএনজিপিএল-এর ব্যাটাররা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েন। দলের হয়ে উইকেটকিপার সাইফুল্লাহ বাঙ্গাস ৩৫ বলে ১৪ রান করে কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও তা যথেষ্ট ছিল না।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সবচেয়ে কম রান ডিফেন্ড করার ইতিহাস
নিচে একটি ছকের মাধ্যমে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সবচেয়ে কম রানের লক্ষ্য দিয়ে জয়ের সেরা ৫টি ঘটনা তুলে ধরা হলো:
| লক্ষ্য (Target) | স্কোর (Final Score) | বোলিং দল | ব্যাটিং দল | মাঠ | সাল |
| ৪০ | ৩৭ | পিটিভি | এসএনজিপিএল | করাচি | ২০২৬ |
| ৪১ | ৩৪ | ওল্ডফিল্ড | এমসিসি | লর্ডস | ১৭৯৪ |
| ৪২ | ৩৪ | ইস্টার্ন প্রভিন্স | বর্ডার | ইস্ট লন্ডন | ১৯৪৭ |
| ৪৪ | ৩৯ | ইংল্যান্ড | কেন্ট ও সাসেক্স | লর্ডস | ১৮৫৬ |
| ৪৯ | ৩২ | কেন্ট | সাসেক্স | হকহার্স্ট | ১৮২৫ |
এই তালিকাটি প্রমাণ করে যে, ১৯ শতকের পর ক্রিকেটে এমন ঘটনা আর ঘটেনি। করাচির এই ম্যাচটি তাই আধুনিক ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন।
বোলিং ইউনিটের অবিশ্বাস্য দাপট এবং রণকৌশল
পিটিভির বোলাররা যেভাবে আক্রমণাত্মক ফিল্ডিং সাজিয়েছিলেন, তা ছিল দেখার মতো। প্রতিটি বল যেন ছিল আগুনের গোলা। এমাদ বাট তার ১০ ওভারে ২৮ রান দিয়ে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে শুরুতেই চাপে ফেলেন বিপক্ষ দলকে। অন্যদিকে, আলী উসমান মাত্র ৯ রান খরচ করে ৬টি উইকেট শিকার করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। এসএনজিপিএল একপর্যায়ে ৭ উইকেটে ২৭ রান তুলে ফেললে ম্যাচটি চূড়ান্ত রোমাঞ্চকর পর্যায়ে পৌঁছায়। ক্রিকেটের ইতিহাসে একই ইনিংসে মাত্র দুজন বোলারের পুরো ম্যাচ শেষ করে দেওয়ার ঘটনাও বিরল। ২৩২ বছর আগে লর্ডসের সেই ম্যাচেও ওল্ডফিল্ডের হয়ে গেটস ও টিম্বার কেবল দুজন বোলার হিসেবে বোলিং করে জয় এনে দিয়েছিলেন। করাচির ম্যাচটি যেন সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি।
কেন এই রেকর্ডটি গুগল নিউজ এবং ডিসকভারে গুরুত্ব পাবে?
বর্তমান সময়ে ক্রীড়া সাংবাদিকতায় এমন তথ্যসমৃদ্ধ এবং ঐতিহাসিক রেকর্ড ব্রেকিং নিউজ পাঠকদের দারুণ আকর্ষণ করে। এই নিউজটি Google Discover এবং Google News-এ জায়গা করে নেওয়ার মতো সব উপাদান রয়েছে। প্রথমত, এটি একটি গ্লোবাল রেকর্ড ব্রেকিং ইভেন্ট। দ্বিতীয়ত, ২৩২ বছরের পুরোনো একটি রেকর্ডের সাথে আধুনিক ক্রিকেটের তুলনা করা হয়েছে। ক্রিকেট প্রেমীরা সবসময়ই এমন অদ্ভুত এবং রেকর্ড গড়া খবর পড়তে পছন্দ করেন।
শেষ কথা
পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটের এই ম্যাচটি আমাদের আবার মনে করিয়ে দিল যে, ম্যাচে জয়ী হওয়ার জন্য কেবল বড় স্কোর নয়, বরং লড়াই করার মানসিকতা প্রয়োজন। ৪০ রানের মতো ছোট পুঁজিতেও যে জয় সম্ভব, তা করে দেখাল পিটিভি। এই জয়টি ক্রিকেট ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং আগামী বহু বছর ধরে গবেষক ও ক্রিকেট প্রেমীদের কাছে আলোচনার খোরাক যোগাবে। ২৩২ বছর পর লর্ডসের রেকর্ড ভেঙে করাচি যে নতুন গৌরব অর্জন করল, তা পাকিস্তানের ক্রিকেটের জন্যও একটি বড় প্রাপ্তি।
