পাকিস্তান কি ইচ্ছা করে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিল?

পাকিস্তান কি ইচ্ছা করে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিল?

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে গতকাল এক নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী হয়েছে ক্রিকেট বিশ্ব। পাকিস্তান বনাম জিম্বাবুয়ে ম্যাচে পাকিস্তানের জয় কেবল একটি সাধারণ জয় ছিল না, বরং এটি ছিল এক গভীর গাণিতিক ও কৌশলী চাল। হারারেতে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে পাকিস্তান জিম্বাবুয়েকে পরাজিত করলেও, সেই জয়ের ধরনে টুর্নামেন্টের সমীকরণ বদলে গেছে মুহূর্তের মধ্যে। পাকিস্তান এমনভাবে ম্যাচটি শেষ করেছে যার ফলে স্কটল্যান্ড বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছে এবং জিম্বাবুয়ে নাম লিখিয়েছে সুপার সিক্সে। ক্রিকেট মহলে এখন বড় প্রশ্ন—পাকিস্তান কি ইচ্ছা করে স্কটল্যান্ডকে বাদ দিল? এই রহস্যের পেছনে লুকিয়ে আছে আইসিসি টুর্নামেন্টের জটিল নেট রানরেট (Net Run Rate) পদ্ধতি।

আরও জেনে নিনঃ ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জন করতে পারে পাকিস্তান

পাকিস্তান বনাম জিম্বাবুয়ে ম্যাচের রহস্য ও স্কটল্যান্ডের বিদায়

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল জিম্বাবুয়ের দেওয়া ১২৯ রান তাড়া করা। পাকিস্তানের সুপার সিক্স আগেই নিশ্চিত ছিল। তবে স্কটল্যান্ডের ভাগ্য ঝুলে ছিল এই ম্যাচের ফলাফলের ওপর। সমীকরণ ছিল এমন—যদি পাকিস্তান জিম্বাবুয়ের এই রান ২৫.২ ওভারের মধ্যে তাড়া করে ফেলে, তবে স্কটল্যান্ড নেট রানরেটে এগিয়ে থেকে সুপার সিক্সে যাবে। কিন্তু পাকিস্তান এই রান তাড়া করতে সময় নিয়েছে ২৬.২ ওভার। অর্থাৎ মাত্র এক ওভারের হেরফেরে স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

ম্যাচের শুরু থেকেই পাকিস্তান বেশ আক্রমণাত্মক ছিল। ১৪ ওভার শেষে তাদের রান ছিল ৮৪। তখন স্কটল্যান্ডের স্বপ্ন পূরণের জন্য পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল মাত্র ১১.২ ওভারে ৪৫ রান। আধুনিক ক্রিকেটে এটি খুবই সহজ এক সমীকরণ। কিন্তু এর পরেই মাঠে দেখা যায় অদ্ভুত এক মন্থরতা। সামির মিনহাস ও আহমেদ হুসেনের ব্যাটিং থেকে হঠাৎ করেই সব আগ্রাসন গায়েব হয়ে যায়। পরের ১২ ওভারে তারা মাত্র ৩৬ রান তোলে এবং টানা ৮৯টি বল কোনো বাউন্ডারি ছাড়াই অতিবাহিত হয়। ২৫ ওভার পার হওয়ার সাথে সাথে সামির মিনহাস হঠাৎ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন এবং পরপর দুটি ছক্কা মেরে ম্যাচ শেষ করেন। এই বিলম্বিত জয়ই স্কটল্যান্ডকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেয়।

পাকিস্তানের চতুর কৌশলের নেপথ্যে নেট রানরেটের খেলা

অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, স্কটল্যান্ডকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানের লাভ কী? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সুপার সিক্সের পয়েন্ট ও নেট রানরেট (Net Run Rate) গণনার পদ্ধতিতে। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী, গ্রুপ পর্বের পয়েন্ট ও রানরেট পরবর্তী ধাপেও যোগ হয়। তবে এখানে একটি বড় শর্ত আছে—পয়েন্ট টেবিলের শুধু সেই দলগুলোর বিপক্ষে ম্যাচগুলোই গণ্য হবে, যারা গ্রুপ থেকে সুপার সিক্সে উঠতে সক্ষম হয়েছে।

পাকিস্তান তাদের গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ড এবং জিম্বাবুয়ে—উভয় দলকেই হারিয়েছে। কিন্তু জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয়ের ব্যবধান ছিল অনেক বড়। সেই ম্যাচে পাকিস্তান ৯ উইকেটে জিতেছিল এবং হাতে ছিল ৩৩.৪ ওভার। অন্যদিকে, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয়টি ছিল তুলনামূলক ছোট ব্যবধানের—৬ উইকেটে জয় এবং হাতে ছিল মাত্র ৬.৫ ওভার।

পাকিস্তান যদি দ্রুত ম্যাচ শেষ করে স্কটল্যান্ডকে সুপার সিক্সে তুলত, তবে পরবর্তী রাউন্ডে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে করা ছোট জয়ের রানরেট তাদের নামের পাশে যোগ হতো। কিন্তু জিম্বাবুয়ে সুপার সিক্সে ওঠায়, তাদের বিপক্ষে করা বড় জয়ের বিশাল রানরেট এখন পাকিস্তানের পয়েন্ট টেবিলে যুক্ত হবে। সহজ কথায়, সুপার সিক্সে নিজেদের শীর্ষস্থান বা ভালো অবস্থান নিশ্চিত করতেই পাকিস্তান এই ‘চতুর কৌশল’ অবলম্বন করেছে।

অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের সমর্থন ও নৈতিকতা বিতর্ক

পাকিস্তানের এই রহস্যময় কৌশল নিয়ে যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা চলছে, তখন জিম্বাবুয়ের সাবেক কিংবদন্তি ক্রিকেটার অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন এবং জানান কেন এটি একটি যৌক্তিক কৌশল ছিল।

কেন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার পাকিস্তানকে সমর্থন করলেন?

অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের মতে, ক্রিকেটে নিয়ম মেনে নিজেদের সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করাটা কোনো অন্যায় নয়। তিনি ইএসপিএনক্রিকইনফোকে (ESPNcricinfo) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পাকিস্তান তাদের জন্য সবচেয়ে লাভজনক পথটিই বেছে নিয়েছে। তিনি মনে করেন:

  • সুপার সিক্সে পাকিস্তানের নেট রানরেট বাড়ানোর জন্য জিম্বাবুয়েকে পরের পর্বে তোলা জরুরি ছিল।

  • প্রথমে জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে তবেই তারা গতির পরিবর্তন করেছে।

  • এটি খেলার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেনি বরং একটি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে।

ফ্লাওয়ার আরও যোগ করেন, স্কটল্যান্ডের জন্য এটি অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও, পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল সম্পূর্ণ পেশাদার সিদ্ধান্ত। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই কৌশলের নৈতিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি।

অতীতে স্টিভ ওয়াহর একই ধরনের কৌশল

ক্রিকেট ইতিহাসে এমন কৌশলী খেলার নজির এটাই প্রথম নয়। ১৯৯৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপেও একই ধরনের দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। ওল্ড ট্রাফোর্ডে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে রান তাড়া করার সময় অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ একই কাজ করেছিলেন। তিনিও চেয়েছিলেন পরবর্তী রাউন্ডে নেট রানরেটের সুবিধা পেতে। তখনকার সুপার সিক্স পর্বেও পয়েন্ট বহনের নিয়ম থাকায় অস্ট্রেলিয়া ধীরগতিতে খেলেছিল যাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোয়ালিফাই করতে পারে এবং অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্ট সুরক্ষিত থাকে।

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের বর্তমান পরিস্থিতি ও পাকিস্তানের সম্ভাবনা

পাকিস্তানের এই কৌশলের ফলে তারা এখন সুপার সিক্সে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। তাদের নেট রানরেট এখন অন্যান্য দলের তুলনায় বেশ ভালো থাকবে। অন্যদিকে জিম্বাবুয়ে ভাগ্যের সহায়তা এবং পাকিস্তানের বদান্যতায় আরও একটি সুযোগ পেল নিজেদের প্রমাণ করার।

সুপার সিক্স পর্বে নেট রানরেটের প্রভাব

সুপার সিক্স বা পরবর্তী রাউন্ডগুলোতে অনেক সময় দেখা যায় একাধিক দলের পয়েন্ট সমান হয়ে যায়। তখন সেমিফাইনাল বা ফাইনালের পথ নির্ধারণ করে দেয় এই নেট রানরেট। পাকিস্তান আগেভাগেই নিজেদের ঝুলি গুছিয়ে রাখল যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিপদে পড়তে না হয়। ক্রিকেটের এই গাণিতিক লড়াই মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

পাকিস্তানের এই জয় নিয়ে সাধারণ দর্শকদের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রেমীদের মধ্যেও এই ঘটনা বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, স্কটল্যান্ডের মতো একটি উদীয়মান ক্রিকেট শক্তির এভাবে বিদায় নেওয়াটা দুঃখজনক। তবে প্রোফেশনাল ক্রিকেটে আবেগের চেয়ে ক্যালকুলেশন যে বড়, পাকিস্তান সেটাই প্রমাণ করল। পাকিস্তানের বোলার আলী রাজা এই ম্যাচে ৩ উইকেট নিয়ে জিম্বাবুয়েকে ধসিয়ে দিয়েছিলেন, যা জয়ের ভিত গড়ে দেয়।

জিম্বাবুয়ে বনাম পাকিস্তান ম্যাচ হাইলাইটস

  • জিম্বাবুয়ের রান: ১২৮ (অল আউট)

  • পাকিস্তানের জয়: ৯ উইকেটে (২৬.২ ওভারে)

  • ম্যান অফ দ্য ম্যাচ: আলী রাজা (৩ উইকেট)

প্রশ্ন-উত্তর (FAQ)

১. পাকিস্তান কি নিয়ম ভঙ্গ করেছে? না, পাকিস্তান আইসিসির কোনো নিয়ম ভঙ্গ করেনি। তারা কেবল নেট রানরেটের হিসাব মাথায় রেখে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেছে।

২. স্কটল্যান্ড কেন বাদ পড়ল? পাকিস্তান যদি ২৫.২ ওভারের মধ্যে ম্যাচ শেষ করত, তবে স্কটল্যান্ড নেট রানরেটে জিম্বাবুয়েকে পেছনে ফেলে সুপার সিক্সে যেতে পারত। পাকিস্তান সেটা না করায় স্কটল্যান্ড বিদায় নেয়।

৩. নেট রানরেট কেন সুপার সিক্সে গুরুত্বপূর্ণ? কারণ গ্রুপ পর্বের সেই দলগুলোর বিপক্ষে পয়েন্ট এবং রানরেট পরবর্তী রাউন্ডে যোগ হয় যারা নিজেরাও পরের রাউন্ডে উঠেছে।

৪. অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার কেন পাকিস্তানের প্রশংসা করলেন? তিনি মনে করেন, পাকিস্তান চতুরতার সাথে নিয়মের সুযোগ নিয়েছে যা টুর্নামেন্টে টিকে থাকার জন্য একটি সঠিক পেশাদার কৌশল।

৫. জিম্বাবুয়ের জন্য এই ম্যাচটি কেমন ছিল? জিম্বাবুয়ে ব্যাটিং ও বোলিংয়ে খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও পাকিস্তানের ধীরগতির কারণে তারা সুপার সিক্সে যাওয়ার টিকেট পেয়েছে।

ক্রিকেট শুধু চার আর ছক্কার খেলা নয়, এটি মস্তিষ্কের লড়াইও বটে। পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ২০২৬-এর এই ম্যাচে যা দেখিয়েছে, তা ক্রিকেটের ‘কৌশলী’ রূপটিকেই সামনে এনেছে। স্কটল্যান্ড হয়তো দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছে, কিন্তু পাকিস্তান প্রমাণ করেছে যে টুর্নামেন্ট জিততে হলে কেবল ভালো খেললেই হয় না, সমীকরণও মেলাতে জানতে হয়। জিম্বাবুয়ে এখন সুপার সিক্সে পাকিস্তানের জন্য এক প্রকার ‘সেফটি নেট’ হিসেবে কাজ করবে। এই ঘটনাটি ক্রিকেট ইতিহাসে দীর্ঘদিন বিতর্কিত বা আলোচিত বিষয় হিসেবে থেকে যাবে।

Related posts

Leave a Comment