বিপিএল ২০২৬-এর ফাইনাল শেষে মিরপুরের আকাশ যখন আতশবাজিতে রাঙানো, তখন মাঠের এক কোণে সপরিবারে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবকের চোখেমুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। তিনি শরীফুল ইসলাম। এবারের বিপিএল বা BPL 2026 মৌসুমে তিনি যা করে দেখিয়েছেন, তা কেবল বাংলাদেশের ক্রিকেটে নয়, বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসেই এক বিরল ঘটনা। আইপিএলে লাসিথ মালিঙ্গার যে রেকর্ডকে এক সময় অক্ষয় মনে করা হতো, সেই রেকর্ড এখন বাংলাদেশের এই বাঁহাতি পেসারের দখলে।
বিপিএল ২০২৬-এ শরীফুল ইসলামের অবিশ্বাস্য অর্জন
এবারের বিপিএলে চট্টগ্রাম রয়্যালসের হয়ে খেলেছেন শরীফুল ইসলাম। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ছিলেন বল হাতে অপ্রতিরোধ্য। ১২ ম্যাচে তিনি শিকার করেছেন ২৬টি উইকেট। একজন পেসারের জন্য যেকোনো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী হওয়া বড় সাফল্য, কিন্তু শরীফুল ছাপিয়ে গেছেন সেই সাফল্যকেও। তিনি কেবল উইকেটই নেননি, প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের রান তোলার পথও একদম বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
আরও জানুনঃ পাকিস্তান কি ইচ্ছা করে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিল?
মালিঙ্গার রেকর্ড ভাঙলেন যেভাবে
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ইকোনমি রেট বা ওভার প্রতি রান দেওয়ার হার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন পর্যন্ত স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের এক মৌসুমে (অন্তত ২৫ উইকেট নেওয়া বোলারদের মধ্যে) আইসিসি টেস্ট খেলুড়ে দেশের বোলারদের সেরা ইকোনমি রেটের রেকর্ডটি ছিল শ্রীলঙ্কান কিংবদন্তি লাসিথ মালিঙ্গার। ২০১১ সালের IPL বা ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের হয়ে মালিঙ্গার ইকোনমি রেট ছিল ৫.৯৫। দীর্ঘ ১৫ বছর পর সেই রেকর্ড ভেঙে দিলেন শরীফুল। এবারের বিপিএলে শরীফুলের ইকোনমি রেট মাত্র ৫.৮৪।
| বোলার | টুর্নামেন্ট | ইকোনমি রেট | উইকেট |
| শরীফুল ইসলাম | বিপিএল ২০২৬ | ৫.৮৪ | ২৬ |
| লাসিথ মালিঙ্গা | আইপিএল ২০১১ | ৫.৯৫ | ২৮ |
| জিতান প্যাটেল | ন্যাটওয়েস্ট ব্লাস্ট ২০১৪ | ৬.১১ | ২৫ |
| তাসকিন আহমেদ | বিপিএল ২০২৪-২৫ | ৬.৪৯ | ২৫ |
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে কিপটে বোলিংয়ের নতুন সংজ্ঞা
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শরীফুল ইসলামের বোলিং গড় বা ইকোনমি সাধারণত ৮-এর আশেপাশে থাকে। কিন্তু এবারের ঘরোয়া এই আসরে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। ৪৪.৫ ওভার বোলিং করে তিনি দিয়েছেন মাত্র ২৬২ রান। অর্থাৎ প্রতি ওভারে ব্যাটাররা তার বিরুদ্ধে ৬ রানও তুলতে পারেননি। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে যেখানে ২০০ রান তাড়া করা নিয়মিত ঘটনা, সেখানে এমন বোলিং ফিগার সত্যিই অবিশ্বাস্য।
শরীফুল বনাম মালিঙ্গা: পরিসংখ্যানের লড়াই
লাসিথ মালিঙ্গা যখন ২০১১ সালে সেই রেকর্ড গড়েছিলেন, তখন তাকে বলা হতো ‘ডেথ ওভার স্পেশালিস্ট’। মালিঙ্গার সেই ইয়র্কার আর স্লোয়ারের দাপটে ব্যাটাররা কুপোকাত হতেন। শরীফুলও এবারের বিপিএলে অনেকটা সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তবে শরীফুলের বিশেষত্ব ছিল তার সুইং এবং সঠিক লেংথ। মালিঙ্গা ৬৩ ওভার বোলিং করে ৫.৯৫ ইকোনমিতে রান দিয়েছিলেন, সেখানে শরীফুল প্রায় ৪৫ ওভার বল করে ৫.৮৪ ইকোনমি বজায় রেখেছেন।
তালিকার শীর্ষে থাকা অন্যান্য বোলাররা
সেরা ইকোনমি রেটের এই তালিকায় আরও অনেক বড় বড় নাম রয়েছে। নিউজিল্যান্ডের জিতান প্যাটেল ২০১৪ সালে ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে ২৫ উইকেট নিয়েছিলেন ৬.১১ ইকোনমি রেটে। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই তালিকার শীর্ষ দশে বাংলাদেশের আরেকজন বোলারও স্থান করে নিয়েছেন। তিনি হলেন তাসকিন আহমেদ। ২০২৪-২৫ বিপিএল মৌসুমে তাসকিন ৬.৪৯ ইকোনমি রেটে ২৫ উইকেট নিয়ে তালিকার নবম স্থানে রয়েছেন।
সেরা বোলিং গড় ও শরীফুলের আধিপত্য
ইকোনমি রেট ছাড়াও বোলিং গড় বা Bowling Average-এও শরীফুল এখন সবার উপরে। আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর বোলারদের মধ্যে এক মৌসুমে সেরা বোলিং গড় এখন শরীফুল ইসলামের।
-
শরীফুল ইসলাম (বিপিএল ২০২৬): ১০.০৭ গড়
-
বেউরান হেনড্রিকস (২০১৩-১৪): ১০.২৮ গড়
-
শাদাব খান (২০২৩-২৪): ১১.৬৪ গড়
বোলিং গড় বলতে বোঝায় প্রতিটি উইকেট নিতে একজন বোলার গড়ে কত রান খরচ করেছেন। শরীফুল প্রতি ১০ রানে একটি করে উইকেট তুলে নিয়েছেন, যা টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ভাবাই যায় না।
ব্যক্তিগত অর্জন যখন পারিবারিক উৎসর্গ
ফাইনাল শেষে শরীফুল তার অর্জিত ট্রফি এবং স্মারক চেক নিজের সন্তানের জন্য উৎসর্গ করেছেন। ফেসবুকে পোস্ট করা তার সেই পারিবারিক ছবিটি এখন ভাইরাল। শরীফুল লিখেছেন, “প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট টা বাবা তোমার জন্য।” যদিও তার দল চট্টগ্রাম রয়্যালস ফাইনালে হেরে রানার্স-আপ হয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে শরীফুল জয় করেছেন কোটি ভক্তের হৃদয়। তার এই সাফল্য বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের বোলারদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
প্রশ্নোত্তর সেকশন
১. শরীফুল ইসলাম বিপিএল ২০২৬-এ মোট কতটি উইকেট পেয়েছেন?
শরীফুল ইসলাম এবারের বিপিএলে মোট ১২টি ম্যাচ খেলে ২৬টি উইকেট শিকার করেছেন।
২. লাসিথ মালিঙ্গার রেকর্ডটি কী ছিল?
মালিঙ্গা ২০১১ সালের আইপিএলে ৫.৯৫ ইকোনমি রেটে বোলিং করেছিলেন, যা এতদিন আইসিসি টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর বোলারদের মধ্যে সেরা রেকর্ড ছিল।
৩. শরীফুলের বর্তমান ইকোনমি রেট কত?
বিপিএল ২০২৬ মৌসুমে শরীফুল ইসলামের ইকোনমি রেট ৫.৮৪, যা মালিঙ্গার চেয়েও ভালো।
৪. এই তালিকায় তাসকিন আহমেদের অবস্থান কত?
ইকোনমি রেটের তালিকায় তাসকিন আহমেদ বর্তমানে নবম স্থানে রয়েছেন (৬.৪৯ ইকোনমি)।
শরীফুল ইসলামের এই রেকর্ডটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি তার কঠোর পরিশ্রম ও সঠিক পরিকল্পনার ফল। বিপিএলের মতো টুর্নামেন্টে যেখানে বিদেশী ব্যাটারদের আধিপত্য থাকে, সেখানে একজন স্থানীয় পেসার হিসেবে মালিঙ্গার মতো কিংবদন্তিকে পেছনে ফেলা মোটেও সহজ ছিল না। শরীফুল ও তাসকিনের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের পেস বোলিং ইউনিট এখন বিশ্বমানের। শরীফুলের এই “হাড়কিপটে” বোলিংয়ের রেকর্ডটি কতদিন অক্ষুণ্ণ থাকে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
