শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দল

শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দল

বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে এক বিস্ময়কর শক্তির নাম হলো শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দল। ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপ রাষ্ট্রটি ক্রিকেটে তাদের যে বীরত্বগাথা তৈরি করেছে, তা সত্যিই অতুলনীয়। একসময় যাকে কেবল একটি ছোট দল হিসেবে গণ্য করা হতো, তারা আজ ক্রিকেটের বড় শক্তিগুলোর একটি। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে আধুনিক ক্রিকেটে এক বিপ্লব ঘটিয়েছিল এই দলটি। টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি২০—সব ফরম্যাটেই লঙ্কান সিংহরা তাদের গর্জন শুনিয়েছে। আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দল এর শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল পথচলা নিয়ে আলোচনা করব।

শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দল এর প্রাথমিক ইতিহাস ও টেস্ট মর্যাদা

শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ব্রিটিশ শাসনের প্রভাবে এখানে ক্রিকেটের চর্চা শুরু হলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের প্রবেশ ঘটে বেশ পরে। ১৯৭৫ সালে প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেয়। তবে ভারত বা পাকিস্তানের মতো তারা শুরুতেই টেস্ট মর্যাদা পায়নি। অনেক সংগ্রামের পর ১৯৮২ সালে শ্রীলঙ্কা আইসিসি থেকে পূর্ণ সদস্য পদ লাভ করে এবং টেস্ট ক্রিকেট খেলা শুরু করে। প্রথম টেস্টেই তারা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াই করে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে তারা হারতে আসেনি।

আরও জানতে পারেনঃ ভারত জাতীয় ক্রিকেট দল

শুরুর দিকে দক্ষিণ এশিয় দেশ হিসেবে তারা বেশ কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে। তবে অর্জুনা রানাতুঙ্গার মতো নেতার আবির্ভাব শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রানাতুঙ্গা কেবল একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সমরনায়ক, যিনি লঙ্কান ক্রিকেটারদের মধ্যে জয়ের ক্ষুধা এবং আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছিলেন।

১৯৯৬ বিশ্বকাপ: বিশ্ব ক্রিকেটে লঙ্কান বিপ্লব

শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দল এর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দিনটি ছিল ১৯৯৬ সালের ১৭ মার্চ। লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ফেভারিট অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে প্রথমবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয় করে শ্রীলঙ্কা। এই জয়টি কেবল একটি ট্রফি ছিল না, এটি ছিল বিশ্ব ক্রিকেটে ক্ষমতার পালাবদল। অর্জুনা রানাতুঙ্গার নেতৃত্বে অরবিন্দ ডি সিলভা, সনাথ জয়াসুরিয়া এবং মুত্তিয়া মুরালিধরনদের সমন্বয়ে গড়া সেই দলটি আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিল।

জয়াসুরিয়া এবং কালুভিথারানা তখন ওপেনিং ব্যাটার হিসেবে পাওয়ার-প্লে’র সর্বোচ্চ ব্যবহারের এক নতুন কৌশল প্রবর্তন করেন। প্রথম ১৫ ওভারে আগ্রাসী ব্যাটিং করে রান তোলার সেই পদ্ধতি আজও ওয়ানডে ক্রিকেটের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডি সিলভার ফাইনালে সেই অনবদ্য সেঞ্চুরিটি আজও ক্রিকেট প্রেমীদের মনে সজীব হয়ে আছে। এই বিশ্বকাপের পর থেকে শ্রীলঙ্কাকে আর কেউ ছোট দল হিসেবে দেখার সাহস করেনি।

আরও জানতে পারেনঃ পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দল

আইসিসি ট্রফি ও প্রধান অর্জনসমূহ

শ্রীলঙ্কা কেবল একবার বিশ্বকাপ জিতেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা পরবর্তী দশকগুলোতে প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দল এর প্রধান সাফল্যগুলো তুলে ধরা হলো:

টুর্নামেন্ট অর্জনের ধরণ সাল
ওয়ানডে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ১৯৯৬
টি২০ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ২০১৪
আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ২০০২
এশিয়া কাপ ৬ বার চ্যাম্পিয়ন ১৯৮৬, ১৯৯৭, ২০০৪, ২০০৮, ২০১৪, ২০২২
ওয়ানডে বিশ্বকাপ রানার্স-আপ ২০০৭, ২০১১

শ্রীলঙ্কা এশিয়া কাপে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি দল। তারা বহুবার ভারতকে হারিয় শিরোপা জয় করেছে। ২০২২ সালে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে তাদের এশিয়া কাপ জয়টি ছিল অসাধারণ এক উদাহরণ।

কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের অবদান

শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দল এমন কিছু খেলোয়াড় তৈরি করেছে যারা বিশ্ব ক্রিকেটের রেকর্ডের বইতে নিজেদের নাম স্থায়ীভাবে লিখে রেখেছেন।

মুত্তিয়া মুরালিধরন: স্পিন জাদুকর

ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা বোলারদের কথা বললে সবার আগে আসবে মুরালিধরনের নাম। টেস্ট ক্রিকেটে তার ৮০০ উইকেট এবং ওয়ানডে ক্রিকেটে ৫৩৪ উইকেট একটি অতিমানবীয় রেকর্ড। তার অদ্ভুত বোলিং অ্যাকশন এবং হাতের কবজির মোচড় বিশ্বের তাবড় তাবড় ব্যাটারদের চোখে অন্ধকার দেখিয়ে দিত। মুরালিধরন ছিলেন শ্রীলঙ্কার জয়ের মূল চাবিকাঠি।

আরও জানতে পারেনঃ ওমান জাতীয় ক্রিকেট দল

কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনে

এই দুই ব্যাটারের নাম একে অপরের পরিপূরক। সাঙ্গাকারা তার ক্ল্যাসিক ব্যাটিং এবং ধারাবাহিকতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি টানা চারটি ওয়ানডে সেঞ্চুরি করার বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলেন ২০১৫ বিশ্বকাপে। অন্যদিকে মাহেলা জয়াবর্ধনে ছিলেন অত্যন্ত কৌশলী এবং বুদ্ধিমান একজন ব্যাটার। তাদের মধ্যকার বন্ধুত্ব এবং জুটির রান ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা জুটি হিসেবে স্বীকৃত। বিশেষ করে টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তাদের ৬২৪ রানের সেই জুটি আজও এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সনাথ জয়াসুরিয়া: মাতারা হ্যারিকেন

ব্যাট হাতে বোলারদের ওপর তান্ডব চালানো ছিল সনাথ জয়াসুরিয়ার প্রধান কাজ। ওপেনিং পজিশনে তিনি যখন মারমুখী হতেন, তখন প্রতিপক্ষের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যেত। কেবল ব্যাটিং নয়, তার বাঁহাতি স্পিনও শ্রীলঙ্কাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জয় এনে দিয়েছে।

২০১৪ টি২০ বিশ্বকাপ জয়

শ্রীলঙ্কা বারবার ফাইনালে গিয়েও শিরোপা না জেতার এক আক্ষেপে পুড়ছিল। ২০০৭ এবং ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং ২০০৯ ও ২০১২ টি২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে তারা ‘চোকার্স’ অপবাদ পেতে শুরু করেছিল। তবে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত টি২০ বিশ্বকাপে ভারতকে হারিয়ে সেই আক্ষেপ দূর করে শ্রীলঙ্কা। কুমার সাঙ্গাকারা এবং মাহেলা জয়াবর্ধনের বিদায়ী ম্যাচ ছিল এটি, যা শিরোপা জয়ের মাধ্যমে এক আবেগঘন সমাপ্তি পায়।

বর্তমান দল ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

সাঙ্গাকারা, জয়াবর্ধনে এবং তিলকরত্নে দিলশানের মতো তারকাদের অবসরের পর শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দল কিছুটা কঠিন সময় পার করেছে। একটি দলের ট্রানজিশন পিরিয়ড সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং হয়। তবে বর্তমানে ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা, চারিত আসালাঙ্কা এবং পাথুম নিসাঙ্কার মতো তরুণরা দায়িত্ব নিতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে শ্রীলঙ্কা আবারও আগের ফর্মে ফিরছে। ২০২৬ সালের জন্য তাদের মূল লক্ষ্য হলো টি২০ এবং ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ পাঁচে ফিরে আসা।

আরও জানতে পারেনঃ বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল

শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট স্টেডিয়াম ও কন্ডিশন

শ্রীলঙ্কার কন্ডিশন মূলত স্পিন সহায়ক। প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে গলে ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়াম পর্যন্ত সবখানেই স্পিনাররা সুবিধা পান। কলম্বো এবং ক্যান্ডির মাঠগুলোতে সবসময়ই ক্রিকেটীয় উৎসবের আমেজ থাকে। বিদেশি দলগুলোর জন্য শ্রীলঙ্কার আর্দ্র আবহাওয়া এবং ঘূর্ণি বল সামলানো সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দল প্রথম কবে বিশ্বকাপ জিতেছিল?

উত্তর: শ্রীলঙ্কা ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছিল।

২. টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক কে?

উত্তর: শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তি বোলার মুত্তিয়া মুরালিধরন ৮০০ উইকেট নিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক।

৩. শ্রীলঙ্কা এশিয়া কাপ কতবার জিতেছে?

উত্তর: শ্রীলঙ্কা এখন পর্যন্ত মোট ৬ বার এশিয়া কাপ শিরোপা জয় করেছে।

৪. শ্রীলঙ্কার বর্তমান টি২০ অধিনায়ক কে?

উত্তর: বর্তমান প্রেক্ষাপটে ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা এবং চারিত আসালাঙ্কারা দলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

৫. লঙ্কানদের প্রিয় হোম গ্রাউন্ড কোনটি?

উত্তর: কলম্বোর আর. প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম এবং পাল্লেকেলে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়াম শ্রীলঙ্কার অন্যতম প্রিয় ভেন্যু।

শেষ কথা

শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দল বিশ্ববাসীকে শিখিয়েছে যে, ছোট ভৌগোলিক সীমানা সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না। সীমিত সম্পদ নিয়েও তারা যেভাবে বিশ্ব শাসন করেছে, তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। ক্রিকেট শ্রীলঙ্কানদের কাছে কেবল একটি খেলা নয়, এটি তাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। যদিও বর্তমান সময়ে তারা কিছুটা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবুও তাদের লড়াকু মানসিকতা বলে দেয় যে লঙ্কান সিংহরা খুব দ্রুতই আবারও বিশ্ব ক্রিকেটে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য ফিরে পাবে। আগামী দিনগুলোতে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে শ্রীলঙ্কা আরও বড় বড় শিরোপা জয় করবে—এমনটাই প্রত্যাশা প্রতিটি ক্রিকেট ভক্তের।

Related posts

Leave a Comment