২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ নিয়ে ফুটবল বিশ্বে বইছে উত্তাল হাওয়া। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ক্রীড়াজগতে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের (ডিএফবি) একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে ২০২৬ বিশ্বকাপ বয়কট করার জোরালো দাবি তুলেছেন। তার এই দাবি ফুটবল মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে এবং ইউরোপের ফুটবল নেতাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
ডিএফবি কর্মকর্তার বিস্ফোরক মন্তব্য
জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের (ডিএফবি) নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং বুন্দেসলিগার জনপ্রিয় ক্লাব সেন্ট পাউলির সভাপতি ওকে গটলিশ সরাসরি জানিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০২৬ বিশ্বকাপ বয়কট করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা উচিত। তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড যেভাবে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধকে আঘাত করছে, তাতে চুপ করে থাকা সম্ভব নয়। তার মতে, আশির দশকের অলিম্পিক বয়কটের চেয়েও বর্তমান পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক।
আরও জানুনঃ বিপিএলে শরীফুল ইসলামের হাড়কিপটে বোলিং
ট্রাম্পের যেসব সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ফুটবল বিশ্ব
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ এই উত্তেজনার মূলে রয়েছে। নিচে এর প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো:
-
গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রস্তাব: ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়ে ট্রাম্প ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করেছেন।
-
বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপ: গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে বিরোধিতা করায় ইউরোপের আটটি দেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন তিনি।
-
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা: ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ভ্রমণ নীতির কারণে অনেক দেশের ফুটবল সমর্থকরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে খেলা দেখার সুযোগ হারাচ্ছেন।
-
ন্যাটো জোটের সংকট: তার কর্মকাণ্ডের ফলে ঐতিহাসিক ন্যাটো জোটে ফাটল ধরার উপক্রম হয়েছে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়িয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বিষয় | বিস্তারিত |
| আয়োজক দেশ | যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো |
| উদ্বোধনী তারিখ | ১১ জুন, ২০২৬ |
| প্রধান আয়োজক | যুক্তরাষ্ট্র (ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন) |
| বিতর্কের মূল কেন্দ্র | ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও টিকিটের উচ্চমূল্য |
বয়কটের যৌক্তিকতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ওকে গটলিশ তার বক্তব্যে ঐতিহাসিক বয়কটের উদাহরণ টেনেছেন। তিনি মনে করেন, ক্রীড়া জগত কখনো রাজনীতির বাইরে থাকতে পারে না। কাতার বিশ্বকাপের সময় জার্মানি যেভাবে মানবাধিকার ইস্যুতে সরব হয়েছিল, এখন ট্রাম্পের বেলায় কেন তারা চুপ থাকবে—এই প্রশ্নও তিনি তুলেছেন। তার মতে, একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারের চেয়ে হাজার হাজার মানুষের নিরাপত্তা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফিফা এবং ডিএফবি সভাপতির অবস্থান
যদিও গটলিশ বয়কটের কথা বলছেন, তবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং ডিএফবি সভাপতি বার্নড নয়েনডর্ফ এ বিষয়ে অনেকটা রক্ষণশীল। কাতার বিশ্বকাপের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর জার্মানির জাতীয় দল এবং কোচ চাইছেন না নতুন কোনো রাজনৈতিক বিতর্কে জড়াতে। তবে গটলিশের দাবি, ফিফা যদি কেবল লাভের কথা ভেবে রাজনৈতিক অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, তবে তা হবে ফুটবলের মূল চেতনার পরিপন্থী।
সমর্থকদের উদ্বেগ ও টিকিটের চড়া দাম
২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে কেবল রাজনীতি নয়, অর্থনৈতিক উদ্বেগও কাজ করছে। এবার বিশ্বকাপের টিকিটের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির কারণে আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীদের জন্য যাতায়াত ও থাকার খরচও আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণ মানুষের মনে ওঠা কিছু প্রশ্ন (FAQ)
১. ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে কেন বিশ্বকাপ বয়কটের কথা উঠছে?
ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখল করার হুমকি, ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপ এবং কঠোর ভ্রমণ নীতির প্রতিবাদে এই বয়কটের দাবি উঠেছে।
২. ওকে গটলিশ কে?
ওকে গটলিশ হলেন জার্মান ক্লাব সেন্ট পাউলির সভাপতি এবং জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের (ডিএফবি) ১০ জন সহসভাপতির একজন।
৩. ২০২৬ বিশ্বকাপ কোথায় অনুষ্ঠিত হবে?
এই বিশ্বকাপটি যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
৪. ফিফা কি এই বয়কট সমর্থন করবে?
এখন পর্যন্ত ফিফা বা জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি এই বয়কট প্রস্তাবের পক্ষে কোনো অবস্থান নেননি, বরং তারা খেলা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী।
ক্রীড়া এবং রাজনীতি সবসময়ই একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে এসেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ বয়কট করার এই ডাক মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। জার্মানির মতো শক্তিশালী ফুটবল শক্তির ভেতর থেকে এমন দাবি ওঠায় বিশ্বকাপের আয়োজক এবং ফিফা কর্তৃপক্ষ যে চাপের মুখে পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শেষ পর্যন্ত মাঠের ফুটবল জয়ী হবে নাকি রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে পড়ে বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ ফিকে হয়ে যাবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে মূল্যবোধ রক্ষার এই লড়াই ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
