২০২৬ সালে উত্তর আমেরিকার তিনটি বিশাল দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় বসতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর। ফুটবল প্রেমীদের জন্য এটি একটি আনন্দের সংবাদ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঠের খেলার চেয়ে এখন মাঠের বাইরের রাজনীতিই বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে। আগামী জুনে শুরু হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্ট ঘিরে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে ইউরোপের আকাশে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত এবং ইউরোপের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এই পরিস্থিতির মূল কারণ। জার্মানি এবং ফ্রান্সের পর এবার সরাসরি নেদারল্যান্ডস থেকেও জোরালোভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপ বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ আদৌ সুষ্ঠুভাবে হবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতা, সমাজকর্মী এবং খোদ ফুটবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে সরব হচ্ছেন। নেদারল্যান্ডসের সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ফুটবল খেলা মানে ট্রাম্পের বিতর্কিত নীতিগুলোকে সমর্থন জানানো। এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কেন নেদারল্যান্ডস এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশ বিশ্বকাপ বর্জনের কথা ভাবছে, ফিফা এবং উয়েফার অবস্থান কী এবং শেষ পর্যন্ত এর ফলাফল কী হতে পারে।
আরও জানুনঃ ডন ব্র্যাডম্যানের ঐতিহাসিক ব্যাগি গ্রিন ৭৫ বছর পর ফিরল অস্ট্রেলিয়ায়
নেদারল্যান্ডস থেকে বয়কটের ডাক: কী ঘটছে আসলে?
ফুটবল বিশ্বে ডাচ বা নেদারল্যান্ডস সব সময়ই একটি শক্তিশালী নাম। তাদের অরেঞ্জ আর্মি বা কমলা জার্সিধারী সমর্থকরা সারা বিশ্বে পরিচিত। কিন্তু এবার সেই নেদারল্যান্ডস থেকেই বিশ্বকাপ বর্জনের শক্তিশালী আওয়াজ উঠেছে। দেশটির অত্যন্ত পরিচিত টেলিভিশন প্রডিউসার এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব টিউন ফন দ্য কেউকেন সরাসরি ডাচ জাতীয় ফুটবল দলকে বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। এটি কেবল একটি মৌখিক আহ্বান নয়, তিনি রীতিমতো একটি অনলাইন পিটিশন চালু করেছেন।
২৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের সকাল পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, টিউন ফন দ্য কেউকেনের এই অনলাইন পিটিশনে প্রায় দেড় লাখ মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। নির্দিষ্ট করে বললে, ১ লাখ ৪২ হাজারের বেশি মানুষ ইতিমধ্যে তাদের সমর্থন জানিয়ে সই করেছেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের সমর্থন প্রমাণ করে যে, সাধারণ ডাচ নাগরিকদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কতটা ক্ষোভ রয়েছে।
পিটিশনে উল্লেখ করা যুক্তিগুলো অত্যন্ত পরিষ্কার এবং ধারালো। সেখানে বলা হয়েছে, এমন একজন প্রেসিডেন্টের দেশে আয়োজিত টুর্নামেন্টে নেদারল্যান্ডসের ফুটবলারদের অংশ নেওয়া নৈতিকভাবে উচিত নয়, যিনি কিনা প্রকাশ্যেই একটি মিত্রদেশকে আক্রমণের হুমকি দিচ্ছেন। পিটিশনের ভাষায়, সবকিছু স্বাভাবিক ধরে নিয়ে ট্রাম্পের আতিথেয়তা গ্রহণ করা এবং খেলায় অংশ নেওয়া মানে হলো তাঁর সম্প্রসারণবাদী এবং আগ্রাসী নীতিকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়া। নেদারল্যান্ডসের জনগণ মনে করছে, খেলার চেয়ে মানবিক মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক অবস্থান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপের অন্যান্য দেশের অবস্থান এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
নেদারল্যান্ডস একা নয়, এই প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলোতেও। জার্মানি এবং বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোতেও বিশ্বকাপ বয়কটের প্রসঙ্গটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে জার্মানির একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং বিখ্যাত ইংলিশ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব পিয়ার্স মরগান আগেই এই বিষয়ে কথা বলেছিলেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ডাচরা।
তবে নীতিনির্ধারক মহলে এখনো কিছুটা দ্বিধা কাজ করছে। তাঁরা এখনই চূড়ান্ত কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন না। ফ্রান্সের ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি মঙ্গলবার ফরাসি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের আপাতত বিশ্বকাপ বর্জনের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে তিনি একটি ইঙ্গিতপূর্ণ কথাও বলেছেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে কী হতে পারে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। অর্থাৎ, পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তবে ফ্রান্স তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতেও পারে।
অন্যদিকে, জার্মানির ক্রীড়ামন্ত্রী ক্রিস্টিয়ানে শেন্ডারলাইন গত সপ্তাহে সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপে জার্মানির অংশগ্রহণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জার্মান ফুটবল কর্তৃপক্ষ এবং ফিফা। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে ফেডারেল সরকার ফুটবল ফেডারেশনের নেওয়া সিদ্ধান্তকেই মেনে নেবে। অর্থাৎ বল এখন ফুটবল কর্তাদের কোর্টে।
বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশনের মন্তব্য ও সতর্কতা
নেদারল্যান্ডসের পাশাপাশি বেলজিয়ামেও বয়কটের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বেলজিয়ামের জন্য বিষয়টি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক কারণ তাদের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচের মধ্যে দুটিই অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, তারা বর্তমানে খেলার প্রস্তুতির দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে। তবে তারা এও নিশ্চিত করেছে যে, খেলাধুলার বাইরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তারা তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।
বেলজিয়ামের ফরাসিভাষী জনগোষ্ঠীর ক্রীড়ামন্ত্রী জ্যাকলিন গালাঁ ‘দ্য ব্রাসেলস টাইম’ পত্রিকাকে বলেছেন, এই মুহূর্তে বেলজিয়াম দল বিশ্বকাপ বয়কট করছে না। তিনি খেলাকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখার পক্ষে মত দেন। তাঁর ভাষায়, সংস্কৃতির মতো খেলাধুলাকেও রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা উচিত। তাই এখনই বয়কটের কথা ভাবা হচ্ছে না।
উয়েফার ভূমিকা এবং আসন্ন বৈঠক
ইউরোপীয় ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা উয়েফা (UEFA) এই পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘গার্ডিয়ান’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত সোমবার বুদাপেস্টে উয়েফার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে যে, যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানো একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে। এই বিষয়ে উয়েফার সদস্যদের মধ্যে এক ধরণের ঐকমত্য বা প্রাথমিক সম্মতি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি ব্রাসেলসে উয়েফার নির্বাহী কমিটির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেই বৈঠকেই বিশ্বকাপ বয়কটের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে এবং বিস্তারিতভাবে আলোচনায় উঠবে। এর ঠিক পরদিন একই শহরে উয়েফার বার্ষিক কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে। এই দুটি দিন বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যদি উয়েফা সম্মিলিতভাবে কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ফিফা বড় ধরণের সংকটে পড়বে।
ট্রাম্পের নীতি এবং ফুটবলে তার প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু নির্দিষ্ট নীতি এবং হুমকি ইউরোপীয় নেতাদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের ‘গ্রিনল্যান্ড’ দখলের হুমকি ইউরোপের দেশগুলোকে বিচলিত করেছে। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, এবং ট্রাম্পের এই ধরনের মন্তব্য ইউরোপের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই রাজনৈতিক উত্তেজনাই ফুটবলের মাঠে গড়িয়েছে।
ব্রাসেলসের ‘ইউনিভার্সিতে লিব্র দ্য ব্রুসেল’ (ইউএলবি)-এর অধ্যাপক জঁ-মিশেল দ্য ওয়াল এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বকাপে না যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। তবে বয়কট করাটা এত সহজ হবে না। কারণ এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি জড়িত। বয়কট নিয়ে আলোচনা করার অর্থই হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবা।
সমর্থকদের ব্যক্তিগত তথ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও সাধারণ দর্শকদের নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ফুটবল সমর্থকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের (Social Media) বিস্তারিত তথ্য প্রদান করার একটি পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ, আপনি যদি খেলা দেখতে যেতে চান, তবে আপনার ফেসবুক, টুইটার বা ইনস্টাগ্রামের তথ্য মার্কিন সরকারকে দিতে হতে পারে।
‘ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ’ নামক সংগঠনটি এই পরিকল্পনাকে ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছে। তারা মনে করছে, এটি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন। বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশনও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। তারা জানিয়েছে, খুব শীঘ্রই তারা তাদের সমর্থক সংগঠন ‘১৮৯৫’-এর সঙ্গে এই বিষয়ে বৈঠকে বসবে এবং পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে।
জাতিগত বৈষম্য এবং ভিসা জটিলতার আশঙ্কা
অধ্যাপক জঁ-মিশেল দ্য ওয়াল আরেকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় সামনে এনেছেন। সেটি হলো ভিসা পাওয়া এবং জাতিগত নিরাপত্তা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সমর্থকরা যদি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেতে সমস্যায় পড়েন, তবে কি এই বিশ্বকাপকে একটি ন্যায্য বা ফেয়ার প্রতিযোগিতা বলা যাবে? ফিফার নিয়ম অনুযায়ী বিশ্বকাপ সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু মার্কিন ভিসা নীতি যদি নির্দিষ্ট কিছু দেশের সমর্থকদের আটকে দেয়, তবে তা টুর্নামেন্টের মূল চেতনার পরিপন্থী।
তিনি আরও একটি শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। যারা দেখতে তথাকথিত ‘শ্বেতাঙ্গ’ নন বা যাদের চুল সোনালি ও চোখ নীল নয়—এমন বেলজিয়ান বা ইউরোপীয় সমর্থকরা কি যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ থাকবেন? ট্রাম্পের শাসনামলে জাতিগত বিদ্বেষের ঘটনা বাড়ার আশঙ্কা থেকেই এই প্রশ্নগুলো উঠছে। অধ্যাপক জঁ-মিশেলের মতে, এখানে বেশ কিছু আইনি অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং এগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার সুযোগ আছে।
বিশ্বকাপ ২০২৬ এর সময়সূচি এবং অনিশ্চয়তা
এত সব বিতর্ক এবং বয়কটের ডাকের মধ্যেই ফিফা তাদের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী টুর্নামেন্ট আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী ১১ জুন ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকাপের পর্দা ওঠার কথা রয়েছে। দীর্ঘ এক মাসের এই টুর্নামেন্ট শেষ হবে ১৯ জুলাই। ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে।
বেলজিয়াম দলের সময়সূচি অনুযায়ী, তারা তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ১৫ জুন। তাদের প্রথম ম্যাচটি হবে সিয়াটলে, প্রতিপক্ষ মিসর। এরপর ২১ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে তারা ইরানের মুখোমুখি হবে এবং গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ২৬ জুন ভ্যাঙ্কুভারে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে রুডি গার্সিয়ার শিষ্যরা। উল্লেখ্য, ভ্যাঙ্কুভার কানাডায় অবস্থিত হওয়ায় এই ম্যাচটি নিয়ে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জটিলতা থাকবে না, কিন্তু বাকি দুটি ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই।
বয়কটের আলোচনা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে এই সময়সূচি সম্পূর্ণ ভেস্তে যেতে পারে। অথবা ইউরোপের বড় দলগুলোকে ছাড়াই হয়তো ফিফাকে একটি জৌলুসহীন বিশ্বকাপ আয়োজন করতে হবে।
প্রতিবাদের ভিন্ন ভাষা
অধ্যাপক জঁ-মিশেল দ্য ওয়াল মনে করেন, যদি শেষ পর্যন্ত বয়কট সম্ভব নাও হয়, তবুও দলগুলোর চুপ করে থাকা উচিত নয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েও প্রতিবাদ জানাতে পারে। খেলার মাঠ বা প্রেস কনফারেন্সকে কাজে লাগিয়ে তারা বিশ্ববাসীর কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। অতীতেও আমরা দেখেছি খেলোয়াড়রা বিভিন্ন ইস্যুতে মাঠে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এবারও তেমন কিছু দেখা যেতে পারে। এই বিশাল আয়োজনকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানানোর একটি বড় সুযোগ রয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলোর হাতে।
ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’ বা সুন্দর খেলা। এটি এমন একটি মাধ্যম যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে এক সুতোয় বাঁধে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ এখন রাজনীতির নোংরা খেলার শিকার হওয়ার পথে। নেদারল্যান্ডসের দেড় লাখ মানুষের স্বাক্ষর, জার্মান ও ফরাসি নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ এবং উয়েফার জরুরি বৈঠক—সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি এবং তার আচরণের প্রভাব আজ খেলার মাঠেও স্পষ্ট।
যদি শেষ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডস বা ইউরোপের বড় কোনো দেশ বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয়, তবে তা হবে ফুটবল ইতিহাসের জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। আবার অন্যদিকে, অন্যায়ের প্রতিবাদে এই বয়কট হতে পারে মানবিকতার জয়। ১১ ফেব্রুয়ারির উয়েফা বৈঠকের দিকে এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব। সেই বৈঠকেই হয়তো নির্ধারিত হবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ভাগ্য। খেলা হবে, নাকি রাজনীতি জিতে যাবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা নিশ্চিত যে, আসন্ন দিনগুলোতে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও তীব্র হতে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিশ্ব ফুটবলের ওপর।
