মিসরের গোল কেন বাতিল হয়েছিল, আর্জেন্টিনার গোল কেন নয়

মিসরের গোল কেন বাতিল

মিসরের গোল কেন বাতিল হয়েছিল, আর্জেন্টিনার গোল কেন নয় বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর এই ম্যাচের পর ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে এই প্রশ্ন। মিসর ৩-২ গোলে হারের পর কোচ, খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের অভিযোগ ছিল, দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় রেফারি ও ভিএআর এক রকম মানদণ্ড অনুসরণ করেননি। তবে সাবেক সিলেক্ট গ্রুপ রেফারি অ্যান্ডি ডেভিসের বিশ্লেষণ বলছে, দুটি ঘটনাই একই রকম দেখালেও ফুটবলের আইন এবং ভিএআর প্রোটোকল অনুযায়ী সেগুলো এক ছিল না। এই প্রতিবেদনে বিতর্কিত দুটি সিদ্ধান্ত, ভিএআরের ব্যাখ্যা, সংশ্লিষ্ট নিয়ম এবং কেন একটিতে গোল বাতিল হলেও অন্যটিতে গোল বহাল রাখা হয়েছে, তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় বিতর্কের শুরু যেভাবে

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হারের পর রেফারিং ও ভিএআরের দুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলে মিসর। দলটির কোচ হোসাম হাসানের দাবি, ৬২ মিনিটে মোস্তফা জিকোর করা গোলটি অন্যায্যভাবে বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে ফাউল হলেও সেটি আমলে নেওয়া হয়নি।

ম্যাচ শেষে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে মিসর কোচ আরও বলেন, হয়তো আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসিকে বিশ্বকাপে টিকিয়ে রাখতেই তাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। অন্যদিকে ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো রেফারিকে ‘জালিম’ বলেও মন্তব্য করেন। এসব বক্তব্যের পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং ভিএআরের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

এই বিতর্কের পর ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন পুরো ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে। সেখানে ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা সাবেক সিলেক্ট গ্রুপ রেফারি এবং সাবেক ভিএআর কর্মকর্তা অ্যান্ডি ডেভিস প্রতিটি সিদ্ধান্ত ফুটবলের আইন অনুযায়ী মূল্যায়ন করেন।

মিসরের গোল কেন বাতিল হয়েছিল, আর্জেন্টিনার গোল কেন নয়—বিতর্কের মূল প্রশ্ন

এই ম্যাচে দুটি মুহূর্ত সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে।

  • ৬২ মিনিটে মোস্তফা জিকোর দুর্দান্ত গোল ভিএআরের মাধ্যমে বাতিল হয়ে যায়।
  • ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মিসর দুটি সম্ভাব্য ফাউলের অভিযোগ তুললেও কোনো পেনাল্টি দেওয়া হয়নি এবং গোলও বহাল থাকে।

বাইরের দৃষ্টিতে দুটি ঘটনাই অনেকের কাছে একই ধরনের মনে হলেও ফুটবলের আইন অনুযায়ী এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল। সেই পার্থক্যই রেফারির দুটি আলাদা সিদ্ধান্তের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মিসরের গোল কেন বাতিল হয়েছিল

ম্যাচের ৬২তম মিনিটে মিসরের ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো অসাধারণ এক গোল করেন। গোলটি হওয়ার পর মিসর ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু গোল উদযাপন শেষ হওয়ার আগেই ভিএআর হস্তক্ষেপ করে।

ভিডিও পর্যালোচনায় দেখা যায়, গোল হওয়ার আগে একই আক্রমণপর্বে মিসরের ডিফেন্ডার মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের বিরুদ্ধে ফাউল করেছিলেন।

ভিএআরের পরামর্শে রেফারি মাঠের পাশের মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি পুনরায় দেখেন। ভিডিও পর্যালোচনা শেষে তিনি গোল বাতিল করার সিদ্ধান্ত দেন।

ভিএআর কী দেখেছিল?

ভিডিও বিশ্লেষণে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

  • মারওয়ান আত্তিয়া প্রতিপক্ষের জার্সি ধরে টেনেছিলেন।
  • একই সঙ্গে তিনি মার্তিনেজের পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন।

এই দুটি ঘটনাই ফুটবলের আইন অনুযায়ী ফাউল হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে ভিএআর মনে করে, গোল হওয়ার আগে সংঘটিত ফাউলটি সরাসরি আক্রমণের ধারাবাহিকতার অংশ ছিল। তাই রেফারিকে অন-ফিল্ড রিভিউ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

অ্যান্ডি ডেভিসের বিশ্লেষণ কী বলছে?

অ্যান্ডি ডেভিসের মতে, ভিএআরের হস্তক্ষেপ পুরোপুরি সঠিক ছিল। তাঁর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মারওয়ান আত্তিয়ার ফাউলের কারণেই আর্জেন্টিনা বল পুনরুদ্ধারের সুযোগ হারায় এবং সেই একই আক্রমণ থেকে মিসর গোল করে।

ফুটবলের বর্তমান আইন অনুযায়ী, যদি একই আক্রমণপর্বে সংঘটিত স্পষ্ট ফাউলের সরাসরি ফল হিসেবে গোল হয়, তাহলে সেই গোল বাতিল করা যায়।

অনেকের প্রশ্ন হতে পারে, ঘটনাটি যেহেতু পেনাল্টি বক্সের অনেক বাইরে ঘটেছিল, তাহলে কেন গোল বাতিল করা হলো? ডেভিসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ফাউলের অবস্থান নয়, বরং সেটি একই আক্রমণপর্বের অংশ কি না—সেটিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

রেফারি যখন ভিডিওতে একই সঙ্গে জার্সি টানা এবং প্রতিপক্ষের পায়ের ওপর পা রাখার দৃশ্য দেখেন, তখন তাঁর সামনে গোল বহাল রাখার সুযোগ খুবই সীমিত হয়ে যায়। ফলে গোল বাতিল করাই ছিল নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত।

ফুটবলের আইন অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ফুটবলের Law 12 (Fouls and Misconduct) অনুযায়ী প্রতিপক্ষকে অবৈধভাবে আটকানো, জার্সি টানা অথবা পায়ের ওপর পা রাখাসবই ফাউলের মধ্যে পড়ে। ভিএআর প্রোটোকল অনুযায়ী গোল হওয়ার আগে একই আক্রমণপর্বে এমন কোনো স্পষ্ট ফাউল হলে সেটি পুনরায় দেখা এবং প্রয়োজন হলে গোল বাতিল করা সম্ভব।

এই কারণেই অ্যান্ডি ডেভিস মনে করেন, শুধুমাত্র গোলটি সুন্দর ছিল বলেই সেটি বহাল রাখা যেত না। নিয়মের দৃষ্টিকোণ থেকে ফাউলটি গোলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল, তাই ভিএআরের হস্তক্ষেপ যথাযথ ছিল।

আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে কেন ফাউল ধরা হয়নি?

মিসরের গোল কেন বাতিল হয়েছিল, আর্জেন্টিনার গোল কেন নয়—এই বিতর্কের দ্বিতীয় অংশটি তৈরি হয় ম্যাচের শেষ দিকে। মিসর দাবি করে, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোল হওয়ার আগে অন্তত দুটি ঘটনায় ফাউল হয়েছিল। তাদের মতে, সেই ফাউলগুলোর যেকোনো একটি আমলে নিলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত।

দুটি ঘটনাই আর্জেন্টিনার পেনাল্টি এলাকার ভেতরে ঘটে এবং দুটিই ভিএআর পরীক্ষা করে। তবে মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মতো কোনো স্পষ্ট ভুল পাওয়া যায়নি বলে ভিএআর সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

প্রথম ঘটনা: হামদি ফাতির জার্সি টানার অভিযোগ

যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আর্জেন্টিনা আক্রমণ গড়ে তোলার সময় মিসরের হামদি ফাতি অভিযোগ করেন, আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার তাঁর জার্সি ধরে টেনেছেন। এরপর ফাতি ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান এবং মিসরের খেলোয়াড়রা পেনাল্টির জোরালো আবেদন করেন।

তবে মাঠের রেফারি সঙ্গে সঙ্গে খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর আক্রমণ অব্যাহত থাকে এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ভিএআরের মূল্যায়ন

ভিডিও পর্যালোচনায় ম্যাক আলিস্টারের জার্সি ধরার ঘটনাটি দেখা হলেও ভিএআর মনে করে, সেটি খুব অল্প সময়ের জন্য হয়েছিল। ওই সংস্পর্শ হামদি ফাতির বল পাওয়ার সুযোগ বা আক্রমণে অংশ নেওয়ার সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেনি।

এই কারণেই ঘটনাটিকে পেনাল্টি দেওয়ার মতো স্পষ্ট ও পরিষ্কার ফাউল হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।

দ্বিতীয় ঘটনা: মোহাম্মদ সালাহর পেনাল্টির আবেদন

ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে আরেকটি বিতর্কিত মুহূর্ত তৈরি হয়। মিসরের অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহ আর্জেন্টিনার পেনাল্টি এলাকায় ঢোকার সময় দাবি করেন, হুলিয়ান আলভারেস তাঁকে ফাউল করেছেন।

সালাহ মাটিতে পড়ে গেলে মিসরের খেলোয়াড়রা আবারও পেনাল্টির আবেদন জানান। কিন্তু রেফারি কোনো ফাউল দেখেননি এবং খেলা চলতে থাকে।

এই ঘটনাটিও ভিএআর বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করে।

অ্যান্ডি ডেভিসের ব্যাখ্যা

অ্যান্ডি ডেভিসের মতে, সালাহর ঘটনায় আলভারেসের পক্ষ থেকে এমন কোনো স্পষ্ট ফাউল ছিল না, যা রেফারির সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট।

ভিডিওতে দেখা যায়, দুই খেলোয়াড়ের বুট একে অপরের সঙ্গে স্পর্শ করে। তবে এটি ছিল উভয় খেলোয়াড়ের স্বাভাবিক গতির ফল। এমন সংস্পর্শ ফুটবলে প্রায়ই দেখা যায় এবং প্রতিটি সংস্পর্শ ফাউল হিসেবে বিবেচিত হয় না।

ডেভিস আরও বলেন, ওই মুহূর্তে সালাহ ফাউলের তুলনায় পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টাই বেশি করেছিলেন। ফলে ভিএআরের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়নি।

ভিএআরের সামনে কেন ‘দ্বিমুখী পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছিল?

এই ম্যাচে ভিএআরের জন্য সবচেয়ে জটিল মুহূর্ত ছিল আর্জেন্টিনার শেষ আক্রমণ। কারণ, ম্যাক আলিস্টারের জার্সি টানার অভিযোগ এবং পরবর্তী গোল—দুটি ঘটনাই একই আক্রমণপর্বের মধ্যে ঘটেছিল।

অ্যান্ডি ডেভিসের ভাষায়, এটি ছিল একটি দ্বিমুখী পরিস্থিতি

  • যদি ম্যাক আলিস্টারের বিরুদ্ধে ফাউল ধরা হতো, তাহলে আর্জেন্টিনার গোল বাতিল হতে পারত।
  • একই সঙ্গে ঠিক আগের মুহূর্তের ঘটনাকে বিবেচনায় এনে মিসর পেনাল্টিও পেতে পারত।

অর্থাৎ একটি সিদ্ধান্ত বদলালে পুরো আক্রমণপর্বের ফলাফলই পরিবর্তিত হয়ে যেত। তাই ভিএআরকে পুরো সিকোয়েন্স একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত ভিডিও বিশ্লেষণে এমন কোনো স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট ভুল পাওয়া যায়নি, যা মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত পাল্টানোর জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। সে কারণেই ভিএআর রেফারির মূল সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

মিসরের গোল কেন বাতিল হয়েছিল, আর্জেন্টিনার গোল কেন নয় দুই সিদ্ধান্তের মধ্যে আসল পার্থক্য

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দুটি ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল ফাউলের প্রকৃতিতে।

মিসরের বাতিল হওয়া গোলআর্জেন্টিনার বহাল থাকা গোল
জার্সি টানা এবং প্রতিপক্ষের পায়ের ওপর স্পষ্টভাবে পা রাখা হয়েছিল।স্বল্প সময়ের জার্সি স্পর্শ এবং স্বাভাবিক গতিতে বুটের সংস্পর্শ হয়েছিল।
ফাউলটি একই আক্রমণপর্বে গোলের সরাসরি কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।সংস্পর্শকে গোল বা আক্রমণের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হয়নি।
ভিএআর রেফারিকে মনিটরে ডেকে অন-ফিল্ড রিভিউ করায়।ভিএআর মাঠের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মতো স্পষ্ট ভুল খুঁজে পায়নি।
গোল বাতিল করা হয়।গোল বহাল থাকে।

এই তুলনা থেকেই বোঝা যায়, দুটি ঘটনার মধ্যে বাহ্যিক মিল থাকলেও ফুটবলের আইন অনুযায়ী তাদের গুরুত্ব এবং প্রভাব এক ছিল না। অ্যান্ডি ডেভিসের বিশ্লেষণও ঠিক এই পার্থক্যকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

Related posts

Leave a Comment