ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা মজা করে বলেছেন, নেইমার বিশ্বের প্রথম ‘হোম অফিস’ করা ফুটবলার। সত্যি বলতে, এই মন্তব্যের পেছনে শুধু রসিকতা নয়, আছে গভীর রাজনীতি এবং নেইমারের বর্তমান শারীরিক অবস্থার বাস্তব চিত্র। বর্তমানে নেইমার ফিলাডেলফিয়ায় দলের সঙ্গে না থেকে নিউ জার্সির বেজক্যাম্পে থেকে পুনর্বাসন করছেন, যাকে লুলা ‘হোম অফিস’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এই ঘটনা শুধু একটি মজার মন্তব্য নয়, বরং ব্রাজিল ফুটবলের বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার খোরাক জোগায়।
নেইমারের ‘হোম অফিস’ বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে?
কোভিড মহামারির সময় ‘হোম অফিস’ শব্দটা সারা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছিল। অফিসে না গিয়ে ঘরে বসে কাজ করাকেই আমরা হোম অফিস বলতাম। লুলা সেটাকেই ফুটবলের জগতে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নেইমার হলো বিশ্বের প্রথম হোম অফিস করা ফুটবলার, যাকে দলে ডাকা হয়েছে।’
মজার বিষয় হলো, নেইমার কিন্তু ঘরে নেই। তিনি আছেন নিউ জার্সির মরিসটাউনে ব্রাজিল দলের বেজক্যাম্পে। কিন্তু দলের বাকি সদস্যরা যখন ম্যাচ খেলতে ফিলাডেলফিয়ায় গেছেন, নেইমার সেখানে যাননি। তিনি চোট কাটিয়ে ওঠার জন্য ক্যাম্পেই রয়ে গেছেন। লুলা আসলে এখানে ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘দলের সঙ্গে না থেকে তুমি আলাদা বসে কাজ করছ, এটা তো হোম অফিসই বটে!’
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা কেন এমন মন্তব্য করলেন?
আসলে পুরো ব্যাপারটার একটা রাজনৈতিক দিকও আছে। লুলা এবং নেইমার—তাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য আছে। নেইমার ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বোলসেনারোর ঘনিষ্ঠ সমর্থক। লুলা আর বোলসেনারো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই লুলার এই মন্তব্যকে শুধু ফুটবলীয় বিশ্লেষণ না দেখে, রাজনৈতিক কটাক্ষ হিসেবেও দেখা উচিত।
ঘটনাটা কী হয়েছিল? গত শুক্রবার বেলো হরিজোন্তেতে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ক্যানসার চিকিৎসায় বিনিয়োগসংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে লুলা এক শিশুর কাছে জানতে চান, ‘ব্রাজিল দলের সেরা খেলোয়াড় কে?’ শিশুটি উত্তর দেয়, ‘নেইমার।’ লুলা তখন রসিকতা করে বলেন, ‘নেইমার তো খেলছেই না! সে হলো বিশ্বের প্রথম হোম অফিস করা খেলোয়াড়!’
নেইমারের চোট কতটা গুরুতর? কখন মাঠে ফিরবেন?
এই ব্যাপারটা অনেকেই জানেন না—নেইমার আসলে কাফে (গোড়ালির উপরের অংশ) চোটে ভুগছেন। এই চোটের কারণে তিনি এক মাসের বেশি সময় ধরে পুনর্বাসনে আছেন। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ সময় আজ সকাল সাড়ে ছয়টায় হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিলের দ্বিতীয় ম্যাচেও তিনি মাঠে নামতে পারবেন না।
এর আগে মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটি ছিল ১-১ গোলে ড্র। সেই ম্যাচেও নেইমার খেলতে পারেননি। আশা করা হচ্ছে, গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি মাঠে ফিরতে পারেন। কিন্তু চোটের ধরণ দেখে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।
লুলার মন্তব্য কি শুধুই মজা, নাকি ব্রাজিল দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ?
আমাদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, লুলার এই মন্তব্য শুধু নেইমারকে নিয়ে নয়, বরং ব্রাজিল ফুটবলের বর্তমান অবস্থা নিয়েও। লুলা মজা করে আরও বলেছেন, ‘এমন দিনও আসবে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে জাতীয় দল বানাতে হবে। এগারোজন পেলের দল!’ আসলে তিনি এখানে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বর্তমান ব্রাজিল দলে পেলে বা রোনালদোর মতো লিজেন্ডের অভাব রয়েছে।
সত্যি বলতে, এই মন্তব্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের হতাশাও লুকিয়ে আছে। ব্রাজিলের মতো দেশ, যারা ফুটবলের জন্মভিটে, তাদের এখন একটি ‘হোম অফিস’ খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। লুলার ভাষায়, ‘গতকালই ইন্টারনেটে এটা দেখলাম।’ তিনি নিজেই স্বীকার করছেন, এই ব্যঙ্গটা ইন্টারনেট থেকে নেওয়া।
নেইমারের অনুপস্থিতি ব্রাজিল দলের জন্য কতটা বড় ধাক্কা?
একটু ভেবে দেখলে, ব্রাজিল দলের জন্য নেইমারের অনুপস্থিতি আসলে অনেক বড় ধাক্কা। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে, যখন দলের সবচেয়ে বড় তারকা ‘হোম অফিস’ করছেন, তখন দলের মনোবলেও প্রভাব পড়ে। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে ড্র হওয়াটাও তার প্রমাণ।
ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলতে পারাটা প্রতিটি ফুটবলারের স্বপ্ন। কিন্তু নেইমার এখন সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পারছেন না। তিনি দলের বেজক্যাম্পে থেকে ফিট হওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, ফিট হয়েও যদি ফর্মে না থাকেন, তাহলে সেই ফর্ম ফিরতে আরও সময় লাগবে।
ব্রাজিল ফুটবলে ‘হোম অফিস’ সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ কী?
আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, লুলার এই মন্তব্য ব্রাজিল ফুটবলের একটি গভীর সমস্যার দিকেও ইঙ্গিত করছে। বর্তমানে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলাররা বিদেশের লিগে বেশি সময় কাটান। অনেক সময় আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য দেশে ফিরতেও তাদের অনীহা দেখা যায়। নেইমার নিজেও পিএসজি ও সৌদি আরবের ক্লাব আল-হিলালের হয়ে খেলেছেন।
প্রেসিডেন্ট স্তরের কোনো ব্যক্তি যখন মজা করে ‘হোম অফিস’ বলেন, তখন সেটা শুধু হাসির খোরাক থাকে না। বরং সেটা দেশের ফুটবল নীতির একটি বড় সমালোচনায় রূপ নেয়। ব্রাজিলকে যদি আবার সেই আগের মতো ‘ফুটবলের দেশ’ হতে হয়, তাহলে তারকা খেলোয়াড়দের আরও বেশি সময় জাতীয় দলের সঙ্গে কাটাতে হবে।
টেবিল: নেইমারের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| চোটের ধরণ | কাফে (গোড়ালির উপরের অংশ) চোট |
| চোটের সময়কাল | ১ মাসের বেশি |
| প্রথম ম্যাচ | মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্র (খেলতে পারেননি) |
| দ্বিতীয় ম্যাচ | হাইতির বিপক্ষে (খেলতে পারবেন না) |
| সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন | গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় ম্যাচ |
| বর্তমান অবস্থান | নিউ জার্সির মরিসটাউনে ব্রাজিলের বেজক্যাম্প |
লুলার বক্তব্য কি সঠিক নাকি অতিরঞ্জিত?
সত্যি বলতে, লুলার বক্তব্যে কিছুটা অতিরঞ্জন আছে। নেইমার আসলে ‘হোম অফিস’ করছেন না—তিনি চোট কাটিয়ে উঠতে পুনর্বাসন করছেন। কিন্তু লুলা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটাকে ব্যঙ্গের ছলে ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে লুলার বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ভুল বলা যাবে না, কিন্তু পুরোপুরি সঠিক বলাও কঠিন।
বাস্তব উদাহরণ হিসেবে, যদি একজন অফিস কর্মী অসুস্থ হয়ে ছুটিতে থাকেন, তাকে আমরা ‘হোম অফিস’ বলি না। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে কটাক্ষ করতে গিয়ে লুলা এই শব্দটা ব্যবহার করেছেন। তাই এই বক্তব্যকে ফুটবলীয় বিশ্লেষণের বদলে রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
ব্রাজিল সমর্থকদের কী ভাবা উচিত?
ব্রাজিল সমর্থকরা অনেক চিন্তিত। নেইমার খেলতে না পারলে দলের আক্রমণভাগ অনেকটাই দুর্বল হয়ে যায়। তবে অন্য খেলোয়াড়দের ভাবা উচিত, এই সুযোগ তাদের নিজেদের প্রমাণ করার। ভিনিসিয়াস জুনিয়র, পাকেতা, মিত্রোভিচ—এরা সবাই মিলে নেইমারের অভাব পূরণ করার চেষ্টা করছেন।
আমাদের মতে, ব্রাজিল সমর্থকদের উচিত নেইমারের প্রতি সমর্থন জানানো। কারণ চোট কাটিয়ে ফিরে আসাটা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই কঠিন। আর লুলার মন্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হিসেবে উড়িয়ে দিয়ে আসল ফুটবলটার দিকে নজর দেওয়া উচিত।
বিশ্বকাপে ‘হোম অফিস’ আর কী কী ঘটনা ঘটেছে?
- ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে পোর্তুগালের ক্যাম্পে এসেছিলেন। তাকে ‘হোম অফিস’ না বললেও, তার অবস্থা আলাদা ছিল।
- আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি ২০২২ বিশ্বকাপে চোট নিয়ে খেলেছেন, কিন্তু কখনও ক্যাম্প থেকে আলাদা হননি।
- ১৯৯৮ বিশ্বকাপে হাস্যকর ঘটনা ঘটেছিল—ব্রাজিলের রোনালদো ফিট না থাকলেও ফাইনালে খেলানো হয়েছিল। সেটাকে ‘হোম অফিস’ না বললেও কাছাকাছি ধারণা পাওয়া যায়।
লুলার মন্তব্য সত্যিই ফুটবল ইতিহাসে একটি মজার অধ্যায় হয়ে থাকবে। কিন্তু এর পেছনের আসল গল্পটা হলো—নেইমারের চোট, দলের সংকট এবং ব্রাজিলের রাজনীতি। এই তিন বিষয় মিলিয়েই তৈরি হয়েছে ‘বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে হোম অফিস করছেন নেইমার’ এমন একটি কাহিনী।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
নেইমার আসলেই ‘হোম অফিস’ করছেন, নাকি এটা শুধু রসিকতা?
এটা পুরোপুরি রসিকতা। নেইমার ‘হোম অফিস’ করছেন না, বরং তিনি নিউ জার্সির বেজক্যাম্পে চোট কাটিয়ে ওঠার জন্য পুনর্বাসন করছেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা রাজনৈতিক কটাক্ষ করে এই মন্তব্য করেছেন।ফুটবল পরিভাষায় এটাকে ‘ইনজুরি রিহ্যাব’ বলা হয়, হোম অফিস নয়।
নেইমার কবে মাঠে ফিরবেন? তার চোট কতটা গুরুতর?
নেইমার কাফে চোটে ভুগছেন, যা গোড়ালির উপরের অংশের চোট। তিনি এক মাসের বেশি সময় ধরে পুনর্বাসনে আছেন। আশা করা হচ্ছে গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি মাঠে ফিরতে পারেন, তবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। প্রথম ম্যাচ মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্র এবং দ্বিতীয় ম্যাচ হাইতির বিপক্ষেও তিনি খেলতে পারেননি।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা কেন নেইমারকে নিয়ে এমন মন্তব্য করলেন?
লুলা ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বোলসেনারোর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। নেইমার বোলসেনারোর সমর্থক। তাই এই মন্তব্য শুধু ফুটবল নয়, রাজনৈতিক কটাক্ষও বটে। একটি অনুষ্ঠানে শিশুটি নেইমারকে সেরা খেলোয়াড় বললে লুলা মজা করে তাকে ‘হোম অফিস’ খেলোয়াড় বলেছেন।
নেইমারের অনুপস্থিতি ব্রাজিল দলের পারফরম্যান্সে কতটা প্রভাব ফেলছে?
ব্রাজিল দলের জন্য নেইমারের অনুপস্থিতি বড় ধাক্কা। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে ড্র হওয়াটা তার প্রমাণ। নেইমার দলের সবচেয়ে বড় তারকা এবং ‘প্লেমেকার’। তার অনেকটাই নির্ভর করে আক্রমণভাগের ওপর। ভিনিসিয়াস জুনিয়র, পাকেতা—এরা চেষ্টা করলেও নেইমারের অভাব পূরণ করা কঠিন।
লুলার ‘এগারোজন পেলের দল’ বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন?
লুলা বলেছেন, ‘এমন দিনও আসবে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে জাতীয় দল বানাতে হবে। এগারোজন পেলের দল!’ তিনি আসলে বর্তমান ব্রাজিল দলে পেলে বা রোনালদোর মতো কিংবদন্তি খেলোয়াড়ের অভাব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। এটা ছিল ব্রাজিল ফুটবলের বর্তমান সংকটের প্রতি ইঙ্গিত।
বিশ্বকাপে এই প্রথম কেউ ‘হোম অফিস’ মন্তব্য পেলেন?
না, এর আগেও বিশ্বকাপে বিভিন্ন খেলোয়াড়কে নিয়ে মজার মন্তব্য হয়েছে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে রোনালদোর ফিটনেস নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। কিন্তু ‘হোম অফিস’ শব্দটি কোভিড মহামারির পর জনপ্রিয় হওয়ায় লুলা সেটাকেই নতুন করে ব্যবহার করেছেন। ফুটবল ইতিহাসে এটাই প্রথম ‘হোম অফিস’ মন্তব্য নয়।
নেইমার কি বিশ্বকাপে মাঠে নামতে পারবেন? সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
নেইমার যদি দ্রুত সুস্থ না হন, তাহলে তার জন্য বিশ্বকাপে মাঠে নামা কঠিন হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চোট কাটিয়ে ফিট হওয়া এবং তারপর ফর্ম ফিরিয়ে আনা। বয়সও তার আর বেশি নেই—নেইমার এখন ৩০ ছাড়িয়েছেন। এই বয়সে চোট কাটিয়ে ফিরতে বেশি সময় লাগে। আশা করা হচ্ছে স্কটল্যান্ড ম্যাচে তিনি খেলতে পারবেন, কিন্তু নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না।
