বিশ্বকাপে একটা মিনিটও খেলার সুযোগ পাননি যে দুর্ভাগারা, তাঁদের তালিকায় আছেন বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ৪৮টি দলের হয়ে মোট ১ হাজার ২৪৮ জন ফুটবলার স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে ১৯৮ জন পুরো টুর্নামেন্টে এক মিনিটও মাঠে নামতে পারেননি। এই সংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৬৬ জন গোলকিপার, যা স্বাভাবিক কারণ প্রতিটি দলকে স্কোয়াডে অন্তত তিনজন গোলকিপার রাখতে হয়, অথচ বেশির ভাগ কোচই পুরো টুর্নামেন্টে একজন গোলকিপারের ওপরই আস্থা রাখেন।
বিশ্বকাপে কেন এত ফুটবলার একেবারেই খেলার সুযোগ পান না?
বিশ্বকাপে একজন ফুটবলার মাঠে নামার সুযোগ না পাওয়ার পেছনে সাধারণত তিনটি কারণ কাজ করে দলের নির্দিষ্ট পজিশনে প্রতিযোগিতা বেশি থাকা, চোটের কারণে ফিট না থাকা, এবং কোচের কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বড় দলগুলোর ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট, কারণ সেখানে প্রতিটি পজিশনে একাধিক মানসম্পন্ন খেলোয়াড় থাকেন।
গোলকিপারদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। একটি দল যদি প্রথম পছন্দের গোলকিপারের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখে এবং সেই গোলকিপার চোটমুক্ত থাকেন, তাহলে বাকি দুই গোলকিপারের মাঠে নামার সুযোগ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এই বিশ্বকাপেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে একাধিক দলের ক্ষেত্রে।
মূল কথা: পজিশনে তীব্র প্রতিযোগিতা, চোট এবং কোচের কৌশলগত পছন্দ এই তিন কারণেই একজন ফুটবলার পুরো বিশ্বকাপে এক মিনিটও মাঠে নামার সুযোগ পান না।
কোন কোন পরিচিত ফুটবলার এবার একেবারেই মাঠে নামতে পারেননি?
২০২৬ বিশ্বকাপে বেশ কয়েকজন পরিচিত ও অভিজ্ঞ ফুটবলার পুরো টুর্নামেন্টে বেঞ্চেই কাটিয়েছেন, যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হয়েছে। নিচে এমন কয়েকজনের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হলো।
এনগোলো কান্তে (ফ্রান্স)
৩৫ বছর বয়সী এনগোলো কান্তে ২০১৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী দলের মাঝমাঠের অন্যতম নির্ভরযোগ্য নাম ছিলেন। তাই এবারের আসরে ফ্রান্সের আটটি ম্যাচের একটিতেও তাঁর না খেলা—এমনকি তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের মতো তুলনামূলক নির্ভার লড়াইয়েও—অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। এটি দেখিয়ে দেয়, বয়স বা অতীত সাফল্য থাকলেও দলে জায়গা পাকা থাকার নিশ্চয়তা দেয় না।
কোবি মাইনু (ইংল্যান্ড)
ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডে এবার প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র। ২০২৪ সালের ইউরো ফাইনালে শুরুর একাদশে থাকা কোবি মাইনু এবার পুরো বিশ্বকাপেই বদলি হিসেবেও বিবেচিত হননি। তিনিই ছিলেন ইংল্যান্ডের একমাত্র আউটফিল্ড খেলোয়াড় যিনি একটি মিনিটও মাঠে নামতে পারেননি।
জেমস ট্র্যাফোর্ড (ইংল্যান্ড)
ইংল্যান্ড তিনজন গোলকিপার নিয়ে বিশ্বকাপে গিয়েছিল, আর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে দ্বিতীয় পছন্দের গোলকিপারও সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে ২৩ বছর বয়সী জেমস ট্র্যাফোর্ডের ভাগ্যে সেই সুযোগ জোটেনি। পুরো টুর্নামেন্ট তাঁকে বেঞ্চেই কাটাতে হয়েছে।
ভিক্টর মুনিয়োজ ও দাভিদ রায়া (স্পেন)
বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের দুই সদস্য ভিক্টর মুনিয়োজ ও দাভিদ রায়া কেউই এক মিনিটও মাঠে নামতে পারেননি। মুনিয়োজ চোটের কারণে শুরুর দিকের ম্যাচগুলো মিস করেছিলেন, পরে আর সুযোগ আসেনি। অন্যদিকে দাভিদ রায়া, যিনি বিশ্বকাপের ঠিক আগের প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন আর্সেনালের নিয়মিত গোলকিপার ছিলেন, স্পেনের গোলকিপিং বিভাগে থাকা তুমুল প্রতিযোগিতার কারণে সুযোগ পাননি। কোচ পুরো টুর্নামেন্টে আস্থা রেখেছিলেন এমন একজন গোলকিপারের ওপর, যিনি টুর্নামেন্ট শেষে সেরা গোলকিপারের পুরস্কারও জিতে নেন। তবে না খেলেও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ ঠিকই পেয়েছেন দুজনেই।
আলেহান্দ্রো গ্রিমালদো (স্পেন)
রক্ষণের বাঁ প্রান্তে সতীর্থের দুর্দান্ত ফর্মের কারণে গ্রিমালদোর আর মাঠে নামা হয়নি। দল আটটি ম্যাচ খেলেছে, তার সবকটিতেই তিনি দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন। তারপরও শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নের পদক গলায় উঠেছে তাঁরও।
ব্রেমার (ব্রাজিল)
জুভেন্টাসের এই সেন্টার ব্যাকের একাদশে জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা শুরু থেকেই কম ছিল, কারণ ব্রাজিলের প্রথম পছন্দের সেন্টার ব্যাক জুটি আগে থেকেই বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। তবু পুরো টুর্নামেন্টে একবারও না নামাটা তাঁর জন্য নিশ্চয়ই হতাশাজনক অভিজ্ঞতা।
রোনাল্দ আরাউহো (উরুগুয়ে)
বার্সেলোনার নিয়মিত এই ডিফেন্ডার চোটের কারণে গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচে বিবেচনায় ছিলেন না, আর শেষ ম্যাচে সুস্থ হয়ে ফিরলেও কোচ তাঁকে মাঠে নামাননি। উরুগুয়ের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পেছনে আরাউহোর অনুপস্থিতিকে অনেকেই একটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন।
গনসালো ইনাসিও (পর্তুগাল)
পর্তুগালের রক্ষণভাগে প্রতিষ্ঠিত জুটি থাকায় ইনাসিওর সুযোগ পাওয়া প্রথম থেকেই কঠিন ছিল। কিছু সময়ের জন্য হলেও মাঠে নামার আশা তিনি করেছিলেন, কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে সেই অপেক্ষাই তাঁর সঙ্গী হয়েছে।
ম্যাটস উইফার (নেদারল্যান্ডস)
সতীর্থের চোটে সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে অনেকে আশা করেছিলেন, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। পুরো টুর্নামেন্ট বেঞ্চে বসেই কাটাতে হয়েছে উইফারকে।
মূল কথা: কান্তে, মাইনু, রায়ার মতো তারকা থেকে শুরু করে একাধিক তরুণ প্রতিভা—দলের কৌশল, প্রতিযোগিতা বা চোটের কারণে অনেকেই এবারের বিশ্বকাপে এক মিনিটও মাঠে নামতে পারেননি।
গোলকিপারদের মধ্যে বেঞ্চে বসে থাকার প্রবণতা এত বেশি কেন?
বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ না পাওয়া ফুটবলারদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই গোলকিপার, আর এর পেছনে একটি সহজ কাঠামোগত কারণ আছে। প্রতিটি দলকে নিয়ম অনুযায়ী স্কোয়াডে অন্তত তিনজন গোলকিপার রাখতে হয়, কিন্তু ম্যাচে একসঙ্গে মাত্র একজনই খেলতে পারেন।
ফলে যেসব দলের প্রথম পছন্দের গোলকিপার পুরো টুর্নামেন্টে অক্ষত ও ফর্মে থাকেন, সেই দলের বাকি দুই গোলকিপারের মাঠে নামার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। এই কাঠামোগত বাস্তবতার কারণেই প্রতিটি বিশ্বকাপেই বহু মানসম্পন্ন গোলকিপার পুরো আসরে একবারও খেলার সুযোগ পান না।
মূল কথা: স্কোয়াডে বাধ্যতামূলক তিনজন গোলকিপার রাখার নিয়ম এবং একজন মাত্র গোলকিপারের ওপর কোচের আস্থা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই বিশ্বকাপে গোলকিপারদের বেঞ্চে বসে থাকার হার এত বেশি।
না খেলেও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন?
একজন ফুটবলারের জন্য পুরো টুর্নামেন্টে না খেলেও শেষে চ্যাম্পিয়নের পদক পাওয়া এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দেয়—আনন্দ ও হতাশা একসঙ্গে কাজ করে। দলের সাফল্যে অবদান রাখার সুযোগ না পেলেও, প্রস্তুতি ক্যাম্প থেকে শুরু করে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ তৈরিতে এই খেলোয়াড়দের ভূমিকা মোটেও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিদিনের অনুশীলনে প্রতিপক্ষের ভূমিকা পালন করে মূল একাদশকে প্রস্তুত করার কাজটি এই খেলোয়াড়েরাই করে থাকেন।
তারপরও ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মঞ্চে একবারও মাঠে নামতে না পারার আক্ষেপ থেকেই যায়, বিশেষ করে যাঁরা ক্লাব ফুটবলে নিয়মিত পারফর্মার। এটি দেখিয়ে দেয়, বিশ্বকাপে সাফল্য শুধু একাদশে থাকা খেলোয়াড়দের নয়, পুরো স্কোয়াডের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
মূল কথা: মাঠে না নামা খেলোয়াড়েরাও দলের প্রস্তুতি ও পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যদিও ব্যক্তিগতভাবে খেলার সুযোগ না পাওয়ার আক্ষেপ তাঁদের থেকেই যায়।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
২০২৬ বিশ্বকাপে মোট কতজন খেলোয়াড় এক মিনিটও খেলার সুযোগ পাননি?
মোট ১ হাজার ২৪৮ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ১৯৮ জন পুরো টুর্নামেন্টে এক মিনিটও মাঠে নামার সুযোগ পাননি।
এই ১৯৮ জনের মধ্যে কতজন গোলকিপার ছিলেন?
এই সংখ্যার মধ্যে ৬৬ জনই গোলকিপার, যা মূলত স্কোয়াডে বাধ্যতামূলক তিনজন গোলকিপার রাখার নিয়মের কারণে ঘটে থাকে।
এনগোলো কান্তে কেন এবারের বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি?
ফ্রান্স কোচ তাঁকে পুরো টুর্নামেন্টে একবারও একাদশে বা বদলি হিসেবে বিবেচনা করেননি, যদিও তিনি ফিট ছিলেন এবং দল আটটি ম্যাচ খেলেছে।
স্পেনের গোলকিপাররা কেন এবার এত কম সুযোগ পেয়েছেন?
স্পেনের কোচ পুরো টুর্নামেন্টে একজন নির্দিষ্ট গোলকিপারের ওপরই আস্থা রেখেছিলেন, যিনি শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের পুরস্কারও জিতেছেন। এই কারণে দলের অন্য গোলকিপারদের মাঠে নামার সুযোগ হয়নি।
না খেলেও কি একজন খেলোয়াড় চ্যাম্পিয়নের পদক পান?
হ্যাঁ, বিশ্বকাপজয়ী দলের পূর্ণ স্কোয়াডের সব সদস্যই চ্যাম্পিয়নের পদক ও সম্মাননা পান, তাঁরা মাঠে নামুন বা না নামুন।
চোটের কারণে কোন খেলোয়াড় এবার বিশ্বকাপে সুযোগ পাননি?
উরুগুয়ের রোনাল্দ আরাউহো ও স্পেনের ভিক্টর মুনিয়োজ—দুজনই চোটের কারণে টুর্নামেন্টের একাংশে বিবেচনায় ছিলেন না, এবং সুস্থ হয়ে ফেরার পরও পরবর্তীতে মাঠে নামার সুযোগ পাননি।
একটি দল স্কোয়াডে সর্বোচ্চ কতজন খেলোয়াড় রাখতে পারে?
২০২৬ বিশ্বকাপে প্রতিটি দলকে নির্দিষ্টসংখ্যক খেলোয়াড় নিয়ে স্কোয়াড গঠন করতে হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত তিনজন গোলকিপার রাখা বাধ্যতামূলক ছিল। সুনির্দিষ্ট স্কোয়াড সংখ্যা ও নিয়মকানুন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ফিফার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট দেখে নেওয়া যেতে পারে।
শেষ কথা
বিশ্বকাপের ছয় সপ্তাহের এই মহাযজ্ঞে প্রতিটি দলের একাদশে জায়গা পাওয়া যতটা কঠিন, ঠিক ততটাই কঠিন পুরো স্কোয়াডে টিকে থেকেও মাঠে না নামতে পারার হতাশা সামলে রাখা। এনগোলো কান্তে থেকে শুরু করে কোবি মাইনু বা জেমস ট্র্যাফোর্ড—প্রত্যেকের গল্পই দেখিয়ে দেয়, বিশ্বকাপের সাফল্য বা ব্যর্থতা কেবল মাঠে থাকা এগারোজনের ওপর নির্ভর করে না, বরং পুরো স্কোয়াডের প্রস্তুতি ও ত্যাগের ওপরও নির্ভর করে।
